আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ১৯১তম জন্মতিথি। এই পুণ্য লগ্নে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে উৎসবের আমেজ। শ্রীরামকৃষ্ণের সাধক জীবনের এক অনন্য ও বিস্ময়কর অধ্যায় হলো তোতাপুরী মহারাজের কাছে তাঁর 'অদ্বৈত বেদান্ত' শিক্ষা। সাকার সাধনা থেকে নিরাকার ব্রহ্মতত্ত্বের সেই উত্তরণের কাহিনি আধ্যাত্মিক জগতের এক পরম সম্পদ।

শ্রীরামকৃষ্ণ ও তোতাপুরীর সেই ঐতিহাসিক মিলনের কাহিনি জেনে নিন।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ছিলেন ভক্তির অবতার। মা ভবতারিণীর সাকার রূপের আরাধনায় তিনি ছিলেন নিমগ্ন। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার পূর্ণতা কেবল এক পথে সীমাবদ্ধ থাকে না। ১৮৬৪ সালের শেষভাগে দক্ষিণেশ্বরের পঞ্চবটীতলে আগমন ঘটে এক দীর্ঘদেহী, উলঙ্গ নাগা সন্ন্যাসীর, যাঁর নাম ছিল তোতাপুরী। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে আদর করে 'ন্যাংটা' বলে ডাকতেন। তোতাপুরী ছিলেন অদ্বৈত বেদান্তের একনিষ্ঠ সাধক, যাঁর কাছে জগৎ ছিল মিথ্যা এবং একমাত্র ব্রহ্মই সত্য।
দুই মহাসাধকের মিলন
তোতাপুরী যখন দক্ষিণেশ্বরে এলেন, তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের উজ্জ্বল মুখমণ্ডল দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে এই যুবক এক উচ্চস্তরের আধার। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে অদ্বৈত বেদান্তের সাধনা করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু মাতৃভক্ত শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের ইচ্ছায় কিছু করতেন না। তিনি পঞ্চবটী থেকে মন্দিরে গিয়ে মা ভবতারিণীর অনুমতি চাইলেন। লোকমুখে প্রচলিত, মা তাঁকে বলেছিলেন, "যা শিখবি যা, তোকে শেখাতেই তো ওর এখানে আসা।"
কাচের টুকরো ও ভৈরবীর জ্ঞান
তোতাপুরী শ্রীরামকৃষ্ণকে নিরাকার ব্রহ্মের ধ্যানে বসার নির্দেশ দিলেন। তিনি চাইলেন শ্রীরামকৃষ্ণ যেন তাঁর মনের সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ মুছে ফেলে কেবল অদ্বৈত সত্তায় লীন হন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ যখনই চোখ বুজতেন, তাঁর হৃদয়ে মা ভবতারিণীর জ্যোতির্ময় সাকার রূপ ভেসে উঠত। তিনি নিরাকার ধ্যান করতে পারছিলেন না।
{{/usCountry}}তোতাপুরী শ্রীরামকৃষ্ণকে নিরাকার ব্রহ্মের ধ্যানে বসার নির্দেশ দিলেন। তিনি চাইলেন শ্রীরামকৃষ্ণ যেন তাঁর মনের সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ মুছে ফেলে কেবল অদ্বৈত সত্তায় লীন হন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ যখনই চোখ বুজতেন, তাঁর হৃদয়ে মা ভবতারিণীর জ্যোতির্ময় সাকার রূপ ভেসে উঠত। তিনি নিরাকার ধ্যান করতে পারছিলেন না।
{{/usCountry}}তোতাপুরী তখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি একটি কাচের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রূদ্বয়ের মাঝে (আজকাল চক্রে) সজোরে ফুটিয়ে দিলেন এবং আদেশ করলেন— "এই বিন্দুতে মনকে স্থির করো!" শ্রীরামকৃষ্ণ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তখন জ্ঞানের তলোয়ার দিয়ে তাঁর আরাধ্য মা-র রূপকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হলেন।
তিন দিনের সমাধি ও তোতাপুরীর বিস্ময়
যে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করতে সাধারণ সাধকের কয়েক যুগ কেটে যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ মাত্র তিন দিনে সেই অবস্থায় পৌঁছে গেলেন। টানা তিন দিন বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থায় সমাধিতে মগ্ন রইলেন তিনি। তোতাপুরী অবাক হয়ে শিষ্য শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং বুঝতে পারলেন তাঁর সামনে বসা এই মানুষটি কোনো সাধারণ সাধক নন, স্বয়ং অবতার। তোতাপুরী নিজে দক্ষিণেশ্বরে প্রায় এগারো মাস অবস্থান করেছিলেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসে তিনিও অনুভব করেছিলেন যে ভক্তি ও জ্ঞান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে তোতাপুরীর আগমন ছিল 'যত মত তত পথ' বাণীর এক বিশেষ প্রয়োগ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে মূর্তিপূজা বা সাকার আরাধনা যেমন সত্য, নিরাকার ব্রহ্মজ্ঞানও তেমনই সত্য। অদ্বৈত বেদান্তের এই কঠিন পথ অতিক্রম করেই তিনি পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দকে "সবই সেই ব্রহ্ম" এই চরম সত্যের পাঠ দিতে পেরেছিলেন।
আজ তাঁর জন্মতিথিতে এই ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের চেতনার ঊর্ধ্বে ওঠার পথ হলো সকল ভেদাভেদ ভুলে সত্যের সন্ধান করা।