Mamata Banerjee: একের পর এক উইকেট পতন! মমতার দল ভাঙার নেপথ্যে কী?
Mamata Banerjee: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। গত কয়েক দিনে একাধিক রাজ্যসভা সাংসদ পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি, লোকসভা এবং বিধানসভাতেও দলের একাংশের মধ্যে বিদ্রোহী সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
Mamata Banerjee: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ক্রিকেট ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করছেন। এক সময় যে দল নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করত, ক্ষমতা হারানোর পর সেই দলই এখন একের পর এক ধাক্কার মুখে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ দল ছাড়ছেন, বিদ্রোহ করছেন বা নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, এই ভাঙনের নেপথ্যে আসল কৌশলী কে?

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। গত কয়েক দিনে একাধিক রাজ্যসভা সাংসদ পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি, লোকসভা এবং বিধানসভাতেও দলের একাংশের মধ্যে বিদ্রোহী সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তাঁরা দলের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন মেরু থেকে উঠে এসেছেন-যাঁদের মধ্যে রয়েছেন এমন একজন প্রবীণ সাংসদ যিনি বছরের পর বছর ধরে দলনেত্রীর পাশে সর্বদা দাঁড়িয়ে থেকেছেন; দলেরই তৈরি করা এক যুব আইকন বা যুবনেতা; ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলের অন্যতম বড় জয়ের কাণ্ডারি এক তারকা (সেলিব্রিটি) প্রার্থী; এবং বাংলার বাইরে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে দলে আনা সর্বভারতীয় স্তরে পরিচিত এক হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই সব নামগুলোকে একসঙ্গে মেলালে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দলের ভেতরের এই অসন্তোষ কোনও সুনির্দিষ্ট আদর্শগত বা দুই প্রজন্মের (নবীন-প্রবীণ) মধ্যকার লড়াই নয়। বরং, এই ক্ষোভের আগুন তৃণমূলের সমস্ত অভ্যন্তরীণ উপদল বা গোষ্ঠীর মধ্যেই সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সুখেন্দুশেখর রায়
প্রতিটি রাজনৈতিক বিদ্রোহেরই একটি নির্দিষ্ট ‘ট্রিগার’ বা অনুঘটকের প্রয়োজন হয়। তৃণমূলের অন্দরের লড়াইয়ে সেই ভূমিকাটিই নিয়েছেন সুখেন্দুশেখর রায়। ক্ষমতার অলিন্দে প্রান্তিক বা পিছনের সারিতে থাকা অন্যান্য অনেক বিদ্রোহীদের মতো নন সুখেন্দুশেখর; তিনি ছিলেন সরাসরি দলের মূল শাসনযন্ত্র তথা এস্টাব্লিশমেন্টেরই অন্যতম প্রধান অংশ। বর্ষীয়ান রাজ্যসভা সাংসদ, পেশায় আইনজীবী এবং সংসদের অন্দরে তৃণমূলের অন্যতম প্রধান ও জোরালো কণ্ঠস্বর সুখেন্দুশেখরকে এতকাল দলনেত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ‘ইনার সার্কেল’-এর সদস্য বলেই গণ্য করা হতো। বছরের পর বছর ধরে সমস্ত বিতর্ক ও সংকটের মুহূর্তে দলকে সামনে থেকে আড়াল করেছেন তিনি।
স্বাভাবিকভাবেই, তাঁর এই দল ছাড়ার বা ইস্তফা দেওয়ার ঘটনাটি স্রেফ একজন সাংসদ হারানোর চেয়ে দলনেত্রীর কাছে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল থেকে দলবদল বা দল ছাড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সুখেন্দুবাবুর এই দল ছাড়ার বিষয়টি অন্য সবার চেয়ে আলাদা; কারণ তিনি এমন একজন নেতা, যাঁর এই বিদ্রোহ থেকে নতুন করে পাওয়ার কিছু ছিল না, বরং হারানোর ছিল অনেক বেশি। বিজেপির কাছে নির্বাচনী ধাক্কার পর থেকেই দলের অন্দরে যে চাপা ক্ষোভ ও গুঞ্জন তৈরি হচ্ছিল, যাকে এতকাল বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক অসন্তোষ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, সুখেন্দুবাবুর এই প্রকাশ্য সমালোচনা তাঁকে এক ধাক্কায় এক বিরাট গ্রহণযোগ্যতা এনে দিল। আসলে, পোড়খাওয়া রাজনীতিকরা সাধারণত ততক্ষণ পর্যন্ত প্রথম পদক্ষেপ বা সবার আগে ‘ঝাঁপ’ দেন না, যতক্ষণ না তাঁরা নিশ্চিত হচ্ছেন যে বাকিরাও তাঁদের পথ অনুসরণ করতে প্রস্তুত।
সায়নী ঘোষ
তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ হিসেবে যে প্রজন্মকে তুলে ধরার কথা ছিল, সায়নী ঘোষ মূলত সেই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিনোদন জগৎ বা টলিউড থেকে রাজনীতিতে আসা সায়নী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দলের শীর্ষ স্তরে উঠে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত তৃণমূল যুব কংগ্রেসের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। দলের অন্দরে তাঁর এই দ্রুত উত্থানকে প্রায়শই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারপাশে একটি তরুণ ও নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখা হতো। ফলে, খোদ সায়নীর মুখ থেকেও এখন বিদ্রোহ বা ক্ষোভের সুর চড়াতে শুরু করায় সেই যুক্তিটি সম্পূর্ণ খণ্ডন হয়ে গেল-যেখানে দাবি করা হচ্ছিল যে এই বর্তমান অসন্তোষটি কেবলই দলের প্রবীণ বনাম নবীন শিবিরের মধ্যকার এক অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই।
ইউসুফ পাঠান
কোনও দীর্ঘ রাজনৈতিক অতীত বা ‘পলিটিক্যাল ব্যাগেজ’ ছাড়াই সম্পূর্ণ এক অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং বিপুল জনপরিচিতি নিয়ে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন ইউসুফ পাঠান। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে তাঁর জয় ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম সবচেয়ে উদযাপিত এবং বড় সাফল্য। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান হেভিওয়েট নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে পরাজিত করে পাঠান এটি প্রমাণ করেছিলেন যে, এক সময়ের ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত জেলাগুলোতেও তারকাদের জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক চালচিত্র পুরোপুরি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে দল। তবে সংসদে আসন সংখ্যা বাড়ানোর চেয়েও তাঁর গুরুত্ব দলের কাছে ছিল অনেক বেশি গভীর। প্রকৃতপক্ষে, ইউসুফ পাঠান ছিলেন বাংলার চেনা বা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে গিয়ে তৃণমূলের একটি সর্বভারতীয় ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কৌশলী প্রয়াস। নির্বাচনী রাজনীতিতে দেশজুড়ে সুপরিচিত মুখগুলোকে নিয়ে এসে দলকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য, প্রসারিত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তুলে ধরার যে বৃহত্তর রণকৌশল দল নিয়েছিল, পাঠান ছিলেন মূলত তারই অন্যতম প্রধান অংশ।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার
কাকলি ঘোষ দস্তিদার মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের সেই ঐতিহ্যবাহী সাংগঠনিক মেরুদণ্ডেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। পেশায় চিকিৎসক এবং বারাসত কেন্দ্র থেকে একাধিকবারের সাংসদ কাকলিদেবী দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সংসদীয় মুখগুলোর মধ্যে অন্যতম। তৃণমূলের সাম্প্রতিক বহু নতুন মুখের বিপরীতে, তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব নির্বাচনী ক্ষেত্রে নিরলস কাজ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দুর্গে সংগঠনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মধ্য দিয়ে। টেলিভিশনের পর্দার চেয়েও দলে তাঁর গুরুত্ব মূলত তাঁর গভীর সাংগঠনিক প্রভাবের কারণে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতো নেতারা জেলা স্তরের সেই নেটওয়ার্ক বা দলীয় কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন, যা বিগত বহু বছর ধরে তৃণমূলের নির্বাচনী জয়যাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। স্বাভাবিকভাবেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কাকলিদেবীর মতো নেতাদের আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি; কারণ তাঁরাই রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে দলের একেবারে নিচুতলার বা তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যকার প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করেন।
দেব
বাংলার অন্যতম তারকা তথা ঘাটালের সাংসদ দেব এক দশকেরও বেশি সময় নির্বাচনী রাজনীতিতে কাটিয়েছেন এবং নিজেকে একজন নিছক ‘সেলিব্রিটি প্রার্থী’ থেকে ধীরে ধীরে এক পরিপক্ব ও গম্ভীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছেন। স্রেফ প্রতীকী বা প্রচারের আলো কাড়ার জন্য রাজনীতিতে আসা অন্য অনেক অভিনেতার মতো নন দেব; তিনি নিজের নির্বাচনী ক্ষেত্রে নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রাখার পাশাপাশি দলের অন্যতম প্রধান ও সুপরিচিত মুখ হিসেবে এক নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছেন। ফলে, তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে তাঁর গুরুত্ব কেবল একটি সংসদীয় আসনের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু বছর ধরে দেব দলের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘স্টার ক্যাম্পেইনার’ বা তারকা প্রচারক হিসেবে কাজ করছেন, বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। তৃণমূলের চেনা চড়া বা আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক শৈলীর পাশাপাশি দল যে এক ধরণের কোমল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চায়-দেব মূলত তারই প্রতীক। ঠিক এই কারণেই বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে থাকার গুঞ্জনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ দেব সাধারণত দলের ভেতরের কোনও উপদলীয় বা গোষ্ঠী কোন্দল থেকে সবসময় এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। দলের প্রবীণ নেতা বা নতুন কোনও ক্ষমতার কেন্দ্র-কোনও পক্ষের সঙ্গেই তাঁকে এর আগে কখনও সরাসরি যুক্ত হতে দেখা যায়নি।
শত্রুঘ্ন সিনহা
বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামগুলোর মধ্যে বাংলার বাইরে যদি কারও সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব থেকে থাকে, তবে তিনি হলেন শত্রুঘ্ন সিনহা। প্রাক্তন বিজেপি নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম সুপরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ শত্রুঘ্ন সিনহাকে তৃণমূলে নিয়ে আসা হয়েছিল মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজেকে জাতীয় স্তরের বিরোধী নেত্রী হিসেবে তুলে ধরার কৌশলী প্রয়াসের অংশ হিসেবে। দলের কাছে তাঁর গুরুত্ব কখনোই কেবল ভোটের অঙ্কে মাপা হয়নি; তাঁর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে তাঁর সর্বভারতীয় দৃশ্যমানতা ও পরিচিতির মধ্যে। আসলে, জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে চাওয়া যে কোনও আঞ্চলিক দলের জন্যই শত্রুঘ্ন সিনহার মতো ব্যক্তিত্বরা রাজ্যের সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বিরাট রাজনৈতিক ক্ষেত্র বা ‘ব্যান্ডউইথ’ তৈরি করতে সাহায্য করেন। তাঁদের এই উপস্থিতি মূলত দলের সর্বভারতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই জানান দেয়।
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতাদের তালিকা
লোকসভা সাংসদ
১. কাকলি ঘোষ দস্তিদার
২. শত্রুঘ্ন সিনহা
৩. ইউসুফ পাঠান
৪. সায়নী ঘোষ
৫. দেব (দীপক অধিকারী)
৬. অরূপ চক্রবর্তী
৭. বাপি হালদার
৮. জগদীশ বাসুনিয়া
৯. প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
১০. শর্মিলা সরকার
১১. পার্থ ভৌমিক
১২. অসিত মাল
১৩. মিতালী বাগ
১৪. শতাব্দী রায়
পদত্যাগকারী রাজ্যসভা সাংসদ
১. সুখেন্দুশেখর রায়
২. সুস্মিতা দেব
৩. প্রকাশ চিক বরাইক
E-Paper

