‘অপরাজিত’ অনীক দত্তের জীবনের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ আজ নির্বাপিত! না ফেরার দেশে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর মতো ছবি দিয়ে অনীক দত্ত বাংলা ছবির নতুন ভবিষ্যৎ গড়েছিলেন। পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জীবনের নানা অদেখা দিক তাঁর ছবির মাধ্যমে নতুন করে ধরা দিয়েছিল বাঙালি দর্শকদের কাছে। তবে আজ সেই ‘অপরাজিত’ অনীক দত্তের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত।
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর মতো ছবি দিয়ে অনীক দত্ত বাংলা ছবির নতুন ভবিষ্যৎ গড়েছিলেন। পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জীবনের নানা অদেখা দিক তাঁর ছবির মাধ্যমে নতুন করে ধরা দিয়েছিল বাঙালি দর্শকদের কাছে। তবে আজ সেই ‘অপরাজিত’ অনীক দত্তের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত। না ফেরার দেশে পরিচালক। বুধবার গ্রীষ্মের এই দুপুরে তাঁর জীবনের এক অদ্ভুত সমাপ্তি। কলকাতার হিন্দুস্তান পার্ক এলাকায় নিজের আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

তবে তাঁর জীবনের শুরুটাও এই কলকাতায় গোলপার্ক এলাকায়। আর বেশ কিছুটা সময় কেটেছে উত্তরবঙ্গে নিজেদের পারিবারিক টি-এস্টেটে। পাহাড় আর ব্যস্ততায় ভরা শহর কলকাতা এই দুইয়ের মিশেলেই তাঁর ছেলেবেলা। তবে ছোটবেলা থেকে তাঁর সঙ্গী ছিল গল্পের বই, কমিকস।
সেই উৎস, তারপর জীবন নানা বাঁক নিতে নিতে তিনিও ঢুকে পড়েন সিনেমার পরিসরে। বিদেশী ছবি থেকে দেশীয় ছবি আর অনেকটা বেশি করে সত্যজিৎ রায়-এ তিনি ডুব দেন। অস্কারজয়ী পরিচালকের শুধু ছবি নয়, তাঁর লেখারও ভক্ত ছিলেন অনীক।
তবে কেবল লেখা বা সিনেমা নয় সত্যজিতের আঁকার প্রতিও বেশ টান ছিল পরিচালকের। তাই কর্মজীবনের প্রথমটায় বিজ্ঞাপন জগতে যোগ দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য লেখা থেকে পরিচালনা সবই করতেন আনন্দের সঙ্গে। বিজ্ঞাপনের ওই অল্প সময়ই তিনি দর্শকদের এমন সব গল্প উপহার দিতেন যে, পণ্যগুলিও দর্শকদের মনে বেশ জায়গা করে নিত।
আর এই ছোট ছোট গল্প বলতে বলতেই তাঁকে বারবার টেনেছে বড় পর্দা। গল্প বলার পাশাপাশি তিনি দর্শককে বার্তাও দিতে চেয়েছেন, আর সঙ্গে অবশ্যই বজায় রেখেছেন বাঙালিয়ানা। তারই উজ্জ্বল উদাহরণ হল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’।
অনীক দত্তের প্রথম ছবি বক্সঅফিসে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তারপর তাঁর হাত ধরে এসেছে ২০১৩ সালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’। মেঘনাদবধ রহস্য-সহ একাধিক ছবি।
এরপর তিনি তাঁর কর্মজগতের ধ্রুবতারা সত্যজিৎ রায় ও তাঁর 'পথের পাঁচালী' বানানোর সময়কালকে তুলে ধরতে বানিয়েছিলেন 'অপরাজিত'। নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনে প্রথমে এই ছবি মাত্র কয়েক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দর্শকদের ভালোবাসায় বেড়েছিল ছবির হলের সংখ্যা। সাধারণ সিনেমাপ্রেমী দর্শক থেকে শুরু করে শ্যাম বেনেগাল, তরুণ মজুমদারের মতো পরিচালকেরা প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন অনীক এবং তাঁর 'অপরাজিত'-কে।
পরিচালকের সর্বশেষ ছবি 'যতকান্ড কলকাতা'তেই মুক্তি পেয়েছিল গত বছর পুজোর সময়। সেই ছবি মুক্তি নিয়েও নানা জলঘোলা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যে মোড়া এই গল্প পুজোয় নানা ছবির ভিড়েও দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। বক্সঅফিসেও বেশ ভালো ফল করেছিল।
অনীক দত্তের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হল তাঁর গল্প বলার ধরন, বাঙালিআনা, ইতিহাস, শিকড়ের টান আর তার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ। তাঁর প্রতিটি ছবি নানা বার্তা দিলেও তা কখনওই উপদেশমূলক নয়, তাঁর ছবিতে রসায়ন থাকলেও ছিল না মেলোড্রামা। আর এটাই অনীক দত্তকে ব্যতিক্রমী করেছে। তবে তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু একই সঙ্গে দুঃখের ও হতবাক করা। পরিচালকের এই প্রয়ানে শোকের ছায়া টলিপাড়াতে।
E-Paper

