শীতকাল এলেই মোয়া তো খান, কিন্তু কীভাবে এই মিষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল, জানেন কি

দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার জয়নগরের মোয়া তার অতুলনীয় স্বাদ ও গুণমানের জন্য দেশ-বিদেশে বিখ্যাত। এটি কেবল একটি মিষ্টি নয়, এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Published on: Dec 11, 2025 10:06 AM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

শীতকাল মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে খেজুর গুড় আর পিঠাপুলির সুঘ্রাণ। আর এই সময়ের এক অপরিহার্য ও জনপ্রিয় মিষ্টি হলো মোয়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার জয়নগরের মোয়া তার অতুলনীয় স্বাদ ও গুণমানের জন্য দেশ-বিদেশে বিখ্যাত। এটি কেবল একটি মিষ্টি নয়, এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শীতকাল এলেই মোয়া তো খান, কিন্তু কীভাবে এই মিষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল, জানেন কি
শীতকাল এলেই মোয়া তো খান, কিন্তু কীভাবে এই মিষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল, জানেন কি

জয়নগরের মোয়ার ইতিহাস, সৃষ্টির পটভূমি এবং এর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ জেনে নিন।

১. মোয়ার ইতিহাস ও সৃষ্টি (১৮৯০ সাল থেকে)

মোয়ার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন হলেও, জয়নগরের মোয়ার আধুনিক এবং জনপ্রিয় রূপটি প্রায় ১৩০ বছর পুরোনো।

  • সৃষ্টির পটভূমি: লোকমুখে প্রচলিত যে, ১৯ শতকের শেষ দিকে (আনুমানিক ১৮৯০ সালের আশেপাশে) জয়নগর-মজিলপুরের এক দরিদ্র মিষ্টি ব্যবসায়ী পূর্ণচন্দ্র ঘোষ এই মোয়া তৈরি শুরু করেন। প্রথমে এটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল।
  • মূল উপাদান: মোয়া তৈরির প্রধান দুটি উপাদান হলো কনকচূড় ধান থেকে তৈরি খই এবং শীতকালে পাওয়া নলেন গুড় (খেজুর গুড়ের বিশেষ ও উন্নত রূপ)। কনকচূড় খই ছিল সহজলভ্য এবং সুগন্ধযুক্ত, যা মোয়াকে একটি স্বতন্ত্র স্বাদ দিত।
  • প্রাথমিক জনপ্রিয়তা: পূর্ণচন্দ্র ঘোষের মোয়া তার সুগন্ধ এবং নরম, অথচ দৃঢ় গঠনের কারণে দ্রুত খ্যাতি অর্জন করে। প্রথমদিকে ছোট ভাঁড়ে এটি বিক্রি হলেও, ধীরে ধীরে এর চাহিদা বাড়ে।

২. জয়নগরের মোয়া কেন এত বিখ্যাত?

জয়নগরের মোয়ার খ্যাতি কেবল স্বাদের জন্য নয়, এর উৎপাদনের বিশেষত্বের জন্য:

  • কনকচূড় খই: এই মোয়ার সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এর মূল উপাদান, বিশেষ সুগন্ধী কনকচূড় ধানের খই। এই খইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো এটি নরম হয়, কিন্তু মোয়া বানানোর জন্য ব্যবহৃত হলে এটি ভেঙে যায় না বা শক্ত হয় না।
  • নলেন গুড়ের ব্যবহার: এই মোয়াতে অন্য কোনো গুড় নয়, শুধুমাত্র শীতকালে পাওয়া নলেন গুড় (যা খেজুর গাছের রস থেকে তৈরি হয়) ব্যবহার করা হয়। নলেন গুড়ের তীব্র মিষ্টি সুগন্ধ এবং রঙের জন্যই এই মোয়া একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করে।
  • কারিগরী কৌশল: মোয়া তৈরি একটি জটিল শিল্প। এতে জল বা কোনো কৃত্রিম বাইন্ডিং এজেন্ট ব্যবহার করা হয় না। সঠিক তাপমাত্রায় নলেন গুড়ের পাক এবং তার সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে খই মেশানোর কৌশলটি অত্যন্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দাবি রাখে। এই কারিগরী দক্ষতা বংশপরম্পরায় জয়নগরের কারিগরদের মধ্যে সংরক্ষিত আছে।
  • জিআই ট্যাগ (GI Tag): জয়নগরের মোয়া তার স্বতন্ত্রতা এবং ভৌগোলিক উত্সের জন্য ভৌগোলিক ইঙ্গিত বা জিআই ট্যাগ (Geographical Indication Tag) অর্জন করেছে। এই স্বীকৃতি মোয়ার গুণমান ও ঐতিহ্যকে সরকারিভাবে সিলমোহর দিয়েছে।

৩. বাঙালির সংস্কৃতিতে মোয়ার স্থান

  • জয়নগরের মোয়া শুধুমাত্র ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত এক মাস পাওয়া যায়। বাঙালির কাছে এই মোয়া শীতের আগমন এবং উৎসবের আনন্দের প্রতীক। এটি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

জয়নগরের মোয়া তার প্রধান দুটি উপাদান—সুগন্ধী কনকচূড় খই এবং নলেন গুড়ের নিখুঁত সংমিশ্রণ এবং প্রাচীন কারিগরী দক্ষতার কারণে বাঙালির শীতকালীন মিষ্টির বাজারে আজও একচ্ছত্র স্থান দখল করে আছে।