শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রাচীন মিশরের যোদ্ধারা চোখে কাজল দিতেন কেন, জানলে অবাক হবেন
মিশরীয় রাজপরিবার, সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে যোদ্ধারা চোখের চারপাশে ঘন কালো রঙের এই প্রলেপ ব্যবহার করতেন—এর পেছনে নিহিত ছিল গভীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক ও সামরিক কারণ।
প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতিতে কাজল (Kohl), যা 'মেসডেমোট' নামে পরিচিত ছিল, তা কেবল প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার হতো না। মিশরীয় রাজপরিবার, সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে যোদ্ধারা চোখের চারপাশে ঘন কালো রঙের এই প্রলেপ ব্যবহার করতেন—এর পেছনে নিহিত ছিল গভীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক ও সামরিক কারণ।

প্রাচীন মিশরীয় সেনারা কেন চোখে কাজল ব্যবহার করতেন, এই অভ্যাসের বৈজ্ঞানিক ও সামরিক উদ্দেশ্য জেনে নিন।
১. সামরিক এবং ব্যবহারিক সুবিধা (Practical and Military Advantage)
চোখে কাজল ব্যবহারের প্রধান কারণ ছিল সূর্যের তীব্রতা থেকে চোখকে রক্ষা করা, যা যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।
- আলোর ঝলকানি প্রতিরোধ (Anti-Glare Function): মিশরীয়রা সাধারণত মরুভূমি বা উজ্জ্বল আলো ঝলমলে পরিবেশে যুদ্ধ করত। কাজলের কালো রঙ চোখের চারপাশে এক ধরনের ম্যাট বা নিস্তেজ স্তর তৈরি করত, যা সূর্যের তীব্র আলো এবং বালি থেকে প্রতিফলিত হওয়া ঝলকানি (Glare) শোষণ করে নিত।
- লক্ষ্যভেদ সহজ করা: ঠিক যেমন ফুটবল খেলোয়াড়রা চোখের নিচে কালো স্ট্রিপ ব্যবহার করেন, তেমনি কাজলের এই গ্লেয়ার-বিরোধী বৈশিষ্ট্য সেনাদের দূরের জিনিস বা শত্রুর ওপর লক্ষ্য স্থির করতে এবং তাদের চোখকে আরাম দিতে সাহায্য করত।
২. চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যগত কারণ (Medicinal and Health Protection)
প্রাচীন মিশরীয়দের কাজলের উপাদানগুলি ছিল অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এবং রোগ প্রতিরোধী।
- সংক্রমণ প্রতিরোধ: নীল নদ সংলগ্ন এলাকায় মশা এবং মাছিবাহিত চোখের সংক্রমণ (Eye Infections) যেমন কনজাংটিভাইটিস (Conjunctivitis) ছিল একটি সাধারণ সমস্যা। কাজলে থাকা লেড-ভিত্তিক যৌগ, যেমন গ্যালেনা (Galena), এবং অন্যান্য সালফাইডের উপস্থিতি অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত ছিল।
- চোখের সুরক্ষা: বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, কাজলে উপস্থিত এই উপাদানগুলি যখন ত্বকের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি নাইট্রিক অক্সাইড (Nitric Oxide) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড শ্বেত রক্তকণিকার (White Blood Cells) মাধ্যমে চোখের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করত।
৩. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
কাজল ব্যবহারের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- ঈশ্বরের সুরক্ষা: মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, চোখ হলো আত্মার প্রবেশদ্বার। কাজলের ব্যবহার তাদের সূর্য দেবতা রা (Ra) এবং আকাশ দেবতা হোরাস (Horus)-এর সুরক্ষা এনে দেবে। কাজলের চোখ ছিল হোরাস দেবতার চোখের প্রতীক (Eye of Horus)।
- দুষ্ট আত্মা দূর করা: এটি ছিল এক ধরনের ট্যালিসম্যান বা কবজ, যা দুষ্ট আত্মা এবং অমঙ্গলজনক নজর থেকে রক্ষা করত বলে মনে করা হতো।
৪. শেষ কথা
প্রাচীন মিশরীয় সেনারা চোখে কাজল ব্যবহার করতেন কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এটি ছিল একটি বহুমুখী সামরিক কৌশল। সূর্যের ঝলকানি থেকে চোখকে বাঁচানো এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ করা—এই দুটি ব্যবহারিক কারণই কাজলের ব্যবহারকে যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য অপরিহার্য করে তুলেছিল। তাই, এই অভ্যাসটিকে প্রাচীন রসায়ন এবং সামরিক বিজ্ঞানের এক অনন্য মিশ্রণ হিসেবে দেখা হয়।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


