Cox’s Bazar: বাংলাদেশে হুলুস্থূল! সমুদ্রসৈকতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বিরল খনিজ? উত্তোলনের উদ্যোগ নেই

Cox’s Bazar: কক্সবাজারের বালিতে ইউরেনিয়ামের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাননি গবেষকেরা। তবে তেজস্ক্রিয় ধাতু-সহ বেশ কিছু মূল্যবাদ খনিজ পাওয়া গেছে।

Published on: Apr 26, 2026, 21:50:45 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

Cox’s Bazar: বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের পর এবার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে মূল্যবান সম্পদের ভাণ্ডারের হদিশ পেলেন গবেষকরা। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে ওপার বাংলায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও আগ্রহ দেখায়নি সরকার। জানা গেছে, সেখানে কিছু এলাকার বালিতে মূল্যবান খনিজ ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় খনিজ। পাশাপাশি জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট, লিউকক্সিন-সহ আরও সাত ধরনের খনিজও পাওয়া যায়, যেগুলো শিল্পকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে সমুদ্রসৈকতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বিরল খনিজ REUTERS
বাংলাদেশে সমুদ্রসৈকতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বিরল খনিজ REUTERS

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজারের বালিতে লুকিয়ে থাকা এই মূল্যবান খনিজ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০ সালে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কক্সবাজার খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’ (বিএসএমইসি)। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পার হলেও এই খনিজগুলোর কোনও বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা ও সম্ভাবনা যাচাইয়ে সীমাবদ্ধ আছে কক্সবাজারের এই ‘কালো সোনা।’

কক্সবাজারে কী ইউরেনিয়াম আছে?

কক্সবাজারের বালিতে ইউরেনিয়ামের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাননি গবেষকেরা। তবে তেজস্ক্রিয় ধাতু-সহ বেশ কিছু মূল্যবাদ খনিজ পাওয়া গেছে। এসব খনিজের একটি হলো মোনাজাইট। এই খনিজের ভেতর স্বল্প মাত্রার ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি আছে বলে এটি তেজস্ক্রিয় ধর্ম প্রদর্শন করে। কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের (বিএসএমইসি) গবেষকেরা জানান, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত ও উপকূলে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা ১৭টি জায়গায় বিরল খনিজ ভাণ্ডার আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে ১৫টি রয়েছে কক্সবাজারে। অপর দুটি খনিজ ভাণ্ডার রয়েছে নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটায়। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সৈকত পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারে পাওয়া গেছে ৬টি খনিজ ভাণ্ডার। এছাড়া মহেশখালীতে ৭টি, মাতারবাড়ীতে ১টি, কুতুবদিয়ায় ১টি ভাণ্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের ১৫টি খনিজ ভাণ্ডারের কোনোটির সীমানাপ্রাচীর কিংবা চিহ্ন নেই।

বিএসএমইসি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা বলছেন, ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কক্সবাজার সৈকতের বালিতে তেজস্ক্রিয় খনিজের সন্ধান পায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) এ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। ১৯৮০ সালে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে বিএসএমইসি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদর মোকাম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার সৈকত, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া সৈকত-সহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় ১৫টি ‘আকর-স্থান’ (খনিজ) আবিষ্কার করেন। গবেষকেরা বহু আগে বালিতে খনিজের সন্ধান পেলেও সেসব পৃথক করার কাজ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। কক্সবাজার খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের প্রাক্তন পরিচালক মো. গোলাম রসুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আবদুল ওয়াজেদ মিয়া ১৯৯৫ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কক্সবাজারে খনিজ বালি পৃথক্‌করণের প্রকল্প চালু করেছিলেন। এরপর পাঁচ বছর আমরা খনিজসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছি। বাণিজ্যিকভাবে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে তখন থেকে সরকারের কাছে নানা প্রস্তাব-সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত খনিজের বাণিজ্যিক আহরণ নিয়ে কোনও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।’

তিনি আরও জানান, কক্সবাজার সৈকত থেকে গবেষকেরা ৮ প্রকারের খনিজ আহরণ করেছেন। এগুলি হলো পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য মোনাজাইট, রং, সিরামিক ও ঢালাইশিল্পের কাঁচামাল জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট ও নিউকক্সিন। ওই গবেষণা অনুযায়ী, ১৭টি জায়গায় খনিজের সম্ভাব্য মজুত ধরা হয়েছিল ২.৫ কোটি মেট্রিকটন। এর মধ্যে ভারী খনিজ বালির পরিমাণ ৪৩.৫ লক্ষ মেট্রিকটন। যার মধ্যে জিরকন ও মোনাজাইট ১৭.৬ লক্ষ টন। যার বাজারমূল্য ১৭ হাজার কোটি টাকা।

খনিজ এলাকার সীমানা চিহ্নিত নেই

বিএসএমইসির কয়েকজন প্রাক্তন পরিচালক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে খনিজ ভাণ্ডার এলাকায় রাস্তা, ভবন-সহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সৈকতের পাশ ধরে ৮৪ কিলোমিটারের ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ’ নির্মিত হয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, বদরমোকাম সৈকত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে। তাতে মূল্যবান খনিজ সম্পদ চাপা পড়ছে উল্লেখ করে গবেষক মো. গোলাম রসুল বলেন, এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে গবেষণার জন্য সৈকত থেকে বালি উত্তোলনের জন্য বিজ্ঞানীদের পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। তাহবিল না থাকায় বিজ্ঞানীদের কাজের ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকী পাইলট প্রকল্পের আওতায় গবেষণার জন্য স্যাম্পল হিসেবে সৈকত থেকে উত্তোলন করা ১ হাজার ৬০০ মেট্রিকটন খনিজ বালির অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রের প্রাক্তন ও বর্তমান কয়েকজন বিজ্ঞানী ও গবেষক বলেন, খনিজ সম্পদ আহরণে অতীতের কোনও সরকার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। খনিজ আহরণের মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিও দেশে নেই। খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলোকে ‘খনিজ সংরক্ষণ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত (ঘোষণা) করে সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রক, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রক, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক, ভূমি ও জলবায়ু, বন ও পরিবেশ মন্ত্রক, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক বিভাগ-সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক ও দফতরের মধ্যে সমন্বয় দরকার। খনিজ সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা দরকার, যা বর্তমানে নেই।

জরাজীর্ণ কেন্দ্রে গবেষণা

শহরের কলাতলী সড়কের পূর্ব পাশে কক্সবাজার সৈকত বালি আহরণ কেন্দ্র (বিএসএমইসি)। ১১.২ একর জমির ওপর প্রধান ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। ৮০ জনবলকাঠামোর এই কেন্দ্রে বর্তমানে আছেন একজন কেন্দ্র পরিচালক, একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, একজন টেকনিক্যাল কর্মকর্তা-সহ ২৪ জন। রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের সময় চোখে পড়ে কেন্দ্রের দৃষ্টিনন্দন সীমানাপ্রাচীর। কিন্তু ভেতরের অবস্থা আশঙ্কাজনক। টানা আধা ঘণ্টা বৃষ্টি হলে পুরো কেন্দ্র হাঁটু জলে ডুবে যায়। প্রধান গেট থেকে কেন্দ্রের যাতায়াতের রাস্তাটিও জলে ডুবে থাকায় হাঁটাচলা করা যায় না। বলতে গেলে পুরো বর্ষা মৌসুম কেন্দ্রটি বন্যার জলে নিমজ্জিত থাকে। কেন্দ্রের বাইরে খোলা মাঠে স্তূপ করে রাখা রয়েছে কয়েকটি খনিজ বালি। সেগুলোও জলের নিচে তলিয়ে গেছে। খনিজ বালির স্তূপে জন্মেছে আগাছা। কেন্দ্রের টেকনিক্যাল কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম বলেন, বেশ কিছু যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়েছে। ছাদ ও দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে, ঝুঁকি নিয়ে কাজ সামলাতে হচ্ছে।

কেন্দ্রের এমন বেহাল অবস্থার কারণ জানতে চাইলে পরিচালক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শেখ জাফরুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রের পূর্ব দিকে উঁচু পাহাড়। আগে পাহাড় থেকে আসা জলের ড্রেন দিয়ে বাঁকখালী নদীতে নেমে যেত। এখন কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে বহুতল ভবনের কয়েকটি হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিম পাশের কলাতলী সড়কটি নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রের জমি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু করে। তাতে বর্ষাজুড়ে কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বন্যার জল সরানোর বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেই।