Super El Niño: ভয়ঙ্কর গরমে জ্বলেপুড়ে যাবে দেশ? ‘সুপার এল নিনো' আতঙ্ক চরমে, আগামী দিনে কী হবে?
Super El Niño: উত্তর ভারতের দিল্লি-এনসিআর, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। শুধু দিন নয়, দিল্লি, হরিয়ানা ও ওড়িশায় রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকছে, যা জনজীবনে চরম অস্বস্তি ডেকে আনছে বলা বাহুল্য।
Super El Niño: বৈশাখের শুরুতেই ভারতের এক বিশাল অংশজুড়ে চলছে আগাম গ্রীষ্মের দাপট। দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে শুরু করে ওড়িশা, কলকাতার কিছু অংশ- সর্বত্রই বইছে লু। যেন ফুটন্ত কড়াইয়ের উপরে বসে রয়েছেন মানুষজন, নীচ থেকে বার্নারের আঁচ বাড়াচ্ছে সূর্য। মৌসম ভবন ইতিমধ্যেই পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার এবং ওড়িশায় তাপপ্রবাহের তীব্র সতর্কতা জারি করেছে। অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৫ ডিগ্রির পারদ ছুঁয়ে ফেলেছে। এর পরের মাসগুলেতে তাহলে কী অপেক্ষা করছে?

মৌসম ভবন জানিয়েছে, প্রচণ্ড গরম অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে, সাধারণত সেই সময়ে ৪০-৪৫ ডিগ্রির ঘরে তাপমাত্রা থাকে, কিন্তু এবার জলবায়ুতে এমনই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে এখনই সেই তাপমাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে দেশের বিভিন্ন অংশ।
এখনই ৪৫ ডিগ্রি, পরে কী হবে?
বিশেষ করে উত্তর ভারতের দিল্লি-এনসিআর, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। শুধু দিন নয়, দিল্লি, হরিয়ানা ও ওড়িশায় রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকছে, যা জনজীবনে চরম অস্বস্তি ডেকে আনছে বলা বাহুল্য। পশ্চিমাঞ্চলে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশেও একই অবস্থা। সেখানেও একাধিক জেলায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রির পারদ ছুঁয়েছে। মহারাষ্ট্রের আকোলাতে তাপমাত্রা ৪৫.৬ ডিগ্রি, পাঞ্জাবের ফরিদকোটে ৪৫.২ ডিগ্রি, ওড়িশার ঝারসুগুড়াতে ৪৪.৬ ডিগ্রি, গুজরাটের আহমেদাবাদে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। গরম এতটাই বেশি পড়ছে যে হিমাচল প্রদেশের মতো পাহাড়ি রাজ্যেও তাপমাত্রা এপ্রিল মাসেই ৪১ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে।
হটস্পট ভারত
আবহাওয়াবিদদের কথায়, চরম তাপমাত্রার নিরিখে ভারত হটস্পট হয়ে উঠছে। বিশ্বের সবথেকে উষ্ণ শহরের তালিকায় ভারতের একাধিক শহরের নাম রয়েছে। উত্তর, মধ্য ও পূর্ব ভারতে আগামিদিনে আরও গরম পড়বে বলেই সতর্ক করা হয়েছে। এপ্রিল থেকেই দাবদাহ, তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ায় সাধারণ জনজীবনেও প্রভাব পড়ছে। অনেকেই দুপুরে বেরতে পারছেন না কাজে। বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলগুলিতে গরমের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাসের শুরু পর্যন্ত গরমের ছুটি থাকে। তবে এখন অনেক স্কুলেই সেই ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া প্রচণ্ড গরমে অসুস্থতা তো রয়েইছে। এই পরিস্থিতিতে শরীরে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
প্রচণ্ড গরম পড়ার নেপথ্যে কী?
এই চরম গরম পড়ার নেপথ্যে রয়েছে ‘সুপার এল নিনো।’ সাধারণ এল নিনোর তুলনায় এটি অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হয়।
কী এই 'সুপার এল নিনো'?
'এল নিনো' হলো একটি জলবায়ুগত ঘটনা, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে যায়। যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা স্থায়ী হয়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক সঞ্চালন প্রক্রিয়া এলোমেলো হয়ে যায় এবং বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়া (যেমন তীব্র খরা বা বন্যা) দেখা দেয়। এক বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদী আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র-সহ বিভিন্ন জলবায়ু মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালে তৈরি হওয়া এই 'এল নিনো' গত ১০০ বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৮২ সালের পর থেকে ‘সুপার এল নিনো ইনডেক্স’-এর মান ক্রমাগত বাড়ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত বিশ্ব উষ্ণায়ন।
ভারতের জলবায়ুতে প্রভাব
কম বৃষ্টি ও খরা: ভারতের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও আবহাওয়ায় সুপার এল নিনোর প্রভাব ভয়ঙ্করভাবে পড়ে। সুপার এল নিনোর প্রভাবে দুর্বল বর্ষা ও খরা দেখা দেয়। কারণ, সুপার এল নিনোর প্রভাবে ভারতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়, যা খরার পরিস্থিতি তৈরি করে।
অত্যধিক গরম ও তাপপ্রবাহ: এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের শুরুতেও ভারতজুড়ে রেকর্ড ভাঙা গরম এর একটি বড় উদাহরণ।
খাদ্য নিরাপত্তা: বৃষ্টি কম হওয়ায় ধান, আখ ও সয়াবিনের মতো খরিফ শস্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে বাজারের খাদ্যমূল্যের ওপর।
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুতে প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গ ভৌগোলিকভাবে গাঙ্গেয় সমভূমি ও হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে এল নিনোর প্রভাব কিছুটা আলাদাভাবে অনুভূত হয়।
বৃষ্টিপাতের ঘাটতি: দক্ষিণবঙ্গে জুন-জুলাই মাসে বৃষ্টিপাতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে আমন ধানের চাষ শুরু করতে চাষিদের সমস্যায় পড়তে হয়।
তীব্র তাপপ্রবাহ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। সুপার এল নিনো এই ‘হিটওয়েভ’ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
শীতের আমেজ হ্রাস: সুপার এল নিনোর বছরে পশ্চিমবঙ্গে শীতকাল ছোট হয়ে আসে এবং শীতের তীব্রতা কমে যায়। ডিসেম্বরেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতি বদল: এল নিনোর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির প্যাটার্ন বদলে যেতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ কমলেও মাঝে মাঝে হঠাৎ তীব্র নিম্নচাপের সৃষ্টি হতে পারে।
প্রসঙ্গত, সুপার এল নিনো শুধু গরমই বাড়ায় না, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকেও বাড়িয়ে দেয়। যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখন হাড়েমাসে টের পাওয়া যাচ্ছে।
E-Paper

