অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির তরফে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ এবং অপ্রত্যাশিত প্রভাবের ওপর আলোকপাত করেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে এই রিসার্চপেপারটি। সেখানে গবেষকরা দাবি করেছেন যে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কেবল পরিবেশের ক্ষতি করছে না, বরং তা মানবজাতির প্রজনন ধারা এবং জন্মহারের লিঙ্গানুপাতকেও (Sex Ratio at Birth) প্রভাবিত করছে। উচ্চ তাপমাত্রা বদলে দিচ্ছে পুত্র-কন্যা জন্মের অনুপাত। অক্সফোর্ডের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগের জন্ম হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে কিছু সরীসৃপ এবং মাছের ক্ষেত্রে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার সময় তাপমাত্রা লিঙ্গ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতকাল কেবল জেনেটিক্সের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করা হত। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির নতুন এই গবেষণা সেই ধারণাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গর্ভাবস্থায় বা গর্ভধারণের প্রাক্কালে মা যখন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকেন, তখন জন্ম নেওয়া শিশুদের লিঙ্গানুপাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গবেষণার মূল ভিত্তি ও প্রাপ্ত তথ্য
অক্সফোর্ডের গবেষক দল গত কয়েক দশকের কয়েক লক্ষ জন্মের ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা দেখেছেন যে, যেসব অঞ্চলে তাপপ্রবাহ (Heatwave) দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে বা যেখানে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে কন্যা সন্তানের তুলনায় পুত্র সন্তান জন্মের হার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। যে সব এলাকার গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির উপরে সেখানে পুরুষ সন্তান জন্ম নেওয়ার অনুপাত কমছে।
গবেষকদের মতে, পুরুষ ভ্রূণ (Male Embryos) স্ত্রী ভ্রূণের তুলনায় তাপমাত্রার প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং দুর্বল। গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে বা জরায়ুর পরিবেশ যখন অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন পুরুষ ভ্রূণের নষ্ট হওয়ার বা গর্ভপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে কন্যা শিশুর জন্মের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
কেন এই লিঙ্গ বৈষম্য?
{{/usCountry}}গবেষকদের মতে, পুরুষ ভ্রূণ (Male Embryos) স্ত্রী ভ্রূণের তুলনায় তাপমাত্রার প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং দুর্বল। গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে বা জরায়ুর পরিবেশ যখন অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন পুরুষ ভ্রূণের নষ্ট হওয়ার বা গর্ভপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে কন্যা শিশুর জন্মের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
কেন এই লিঙ্গ বৈষম্য?
{{/usCountry}}বিজ্ঞানীরা একে 'প্রাকৃতিক নির্বাচন' বা স্ট্রেস রেসপন্স হিসেবে দেখছেন। গবেষণায় বলা হয়েছে:
- জৈবিক দুর্বলতা: উচ্চ তাপমাত্রায় গর্ভবতী মায়ের শরীরে যে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়, তা পুরুষ ভ্রূণ সহ্য করতে পারে না।
- শুক্রাণুর গুণমান: অতিরিক্ত গরমে পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান হ্রাস পায়, যা মূলত ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুগুলোকে বেশি প্রভাবিত করে।
জনতাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব
যদি এই প্রবণতা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তবে বিশ্বের জনসংখ্যায় নারী ও পুরুষের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ড. এলিজাবেথ রিডলি জানান, ‘আমরা যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের অনেক দেশে প্রজনন স্বাস্থ্য এক সংকটের মুখে পড়বে। এটি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জৈবিক অস্তিত্বের লড়াই।’
বিশেষ করে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলো যেখানে তাপমাত্রার পারদ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে এই প্রভাব সবথেকে বেশি অনুভূত হতে পারে। গবেষণায় আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সময়ের আগে শিশু জন্ম (Preterm Birth) এবং মৃত শিশু জন্মের (Stillbirth) হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উত্তরণের পথ কী?
অক্সফোর্ডের এই প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কেবল গাছ লাগানো বা প্লাস্টিক বর্জন নয়, বরং প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি। গর্ভবতী মহিলাদের অতিরিক্ত গরম থেকে রক্ষা করা এবং নগরায়নে শীতল পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।