বাঁচতে নয়, নিজেদের পছন্দেই অন্য প্রজাতির সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হত আদিম নারী, আজও আমাদের রক্তে আছে তাদের চিহ্ন! বলছে গবেষণা
মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে ভাবনা পুরোপুরি বদলে দিতে পারে এই গবেষণার ফল। যাদের সম্পর্কে ভাবা হয়েছিল, তারা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, তারাই হয়তো আমাদের রক্তে বিরাজমান।
মানব বিবর্তনের ইতিহাসে সবথেকে রহস্যময় অধ্যায়গুলির মধ্যে একটি হলো আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) এবং নেয়ানডার্থালদের (Neanderthals) মধ্যকার সম্পর্ক। দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে, এই দুই প্রজাতির মধ্যে প্রজনন বা সংকরীকরণ (Interbreeding) ছিল নেহাতই টিকে থাকার লড়াই বা কোনো আকস্মিক ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই মিলন কেবল টিকে থাকার তাগিদে নয়, বরং এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত ‘সামাজিক পছন্দ’ (Social Choice)।

ফিউচারা সায়েন্সেস (Futura Sciences) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে নেয়ানডার্থালরা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের ডিএনএ (DNA) আজও আধুনিক মানুষের শরীরে বয়ে চলেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মানুষের জেনোমে প্রায় ২ শতাংশ নেয়ানডার্থাল ডিএনএ পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ধরে নৃতত্ত্ববিদরা মনে করতেন, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে এবং বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আধুনিক মানুষ ও নেয়ানডার্থালরা একে অপরের কাছাকাছি এসেছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই আন্তঃপ্রজাতি মিলন ছিল অনেক বেশি জটিল এবং সম্ভবত এটি উভয় গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্তের ফল।
(আরও পড়ুন: এই সময়ের সবচেয়ে রহস্যময় শিল্পী, অবশেষে খসে গেল মুখোশ! আড়ালের মুখটা দেখে হতবাক দুনিয়া)
প্রজনন কি কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে?
পুরানো তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন আধুনিক মানুষ আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রবেশ করে, তখন তারা স্বল্পসংখ্যক নেয়ানডার্থালদের মুখোমুখি হয়। বেঁচে থাকার জন্য সম্পদের ভাগাভাগি এবং গোষ্ঠীগত শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনে তারা মিলিত হয়েছিল। কিন্তু নতুন বিশ্লেষণ বলছে, নেয়ানডার্থালরা মোটেও অসভ্য বা বুদ্ধিহীন ছিল না। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, অলঙ্কার এবং সমাধি দেওয়ার প্রথা ছিল। ফলে আধুনিক মানুষের সাথে তাদের মিলন ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদান।
(আরও পড়ুন: হিমালয়ের এই এলাকায় ছোট মেয়েদের আজও লাল পোশাক পরতে মানা করা হয়! নাহলেই নাকি ধরবে আছেরি ভূত)
সামাজিক পছন্দের ভূমিকা
গবেষকদের মতে, নেয়ানডার্থাল এবং আধুনিক মানুষের মধ্যে শারীরিক ও জিনগত মিল ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা একে অপরকে ‘মানুষ’ হিসেবেই গণ্য করত। এই আন্তঃপ্রজাতি মিলন সম্ভবত কোনো জোরপূর্বক ঘটনা ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ছিল পারস্পরিক সমঝোতা বা পছন্দের ফল।
১. সাংস্কৃতিক বিনিময়: প্রজননের মাধ্যমে কেবল ডিএনএ নয়, বরং দুই গোষ্ঠীর মধ্যে শিকারের কৌশল, পাথরের হাতিয়ার তৈরির পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সামাজিক আচার বিনিময় হয়েছিল।
২. জেনেটিক বৈচিত্র্য: আধুনিক মানুষ সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল যে, নেয়ানডার্থালদের সাথে প্রজনন ঘটালে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম স্থানীয় রোগব্যাধি ও কঠোর জলবায়ু সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করবে। এটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত সামাজিক কৌশল ছিল।
(আরও পড়ুন: গরম পড়তেই দুপুরবেলা মাটিতে শুয়ে পড়ছেন? শরীরের কী হচ্ছে এতে)
নেয়ানডার্থালরা কি হারিয়ে গেছে নাকি মিশে গিয়েছে?
এই নতুন গবেষণাটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—নেয়ানডার্থালরা কি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছিল? অনেক বিজ্ঞানীর মতে, তারা প্রকৃতপক্ষে বিলুপ্ত হয়নি বরং আধুনিক মানুষের বিশাল জনসংখ্যার সাথে মিশে গেছে। এই নিরবচ্ছিন্ন সংকরীকরণ বা ‘ইন্টারব্রিডিং’ সামাজিক পছন্দের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল। ধীরে ধীরে নেয়ানডার্থাল জেনোম আধুনিক মানুষের বিশাল জেনোম পুলের মধ্যে শোষিত হয়ে যায়।

(আরও পড়ুন: আকাশছোঁয়া গ্যাসের দাম! রান্নায় আনুন এই সামান্য বদল, মাসের শেষে বাঁচবে বিপুল টাকা)
বিবর্তনের নতুন পাঠ
এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাচীনকালেও মানুষের সম্পর্ক কেবল জৈবিক প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ ছিল না। সহানুভূতি, বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক বন্ধন স্থাপনের ক্ষমতা আমাদের পূর্বপুরুষদের ডিএনএ-তে আগে থেকেই ছিল। নেয়ানডার্থালরা আজ আমাদের রক্তে বেঁচে আছে এবং তাদের সাথে আমাদের মিলন ছিল মানব ইতিহাসের এক অন্যতম সফল সামাজিক পরীক্ষা।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


