Breathing Problems Symptoms in Bengali: শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাস নেওয়ার সময় সাঁই সাঁই শব্দ এবং সামান্য পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো সমস্যা আজকাল তরুণদের মধ্যেও ক্রমশ বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় এই উপসর্গগুলিকে শারীরিক সক্ষমতার অভাব, ঋতু পরিবর্তন সংক্রান্ত অ্যালার্জি বা সাময়িক সংক্রমণ বলে এড়িয়ে যান অনেকেই। কিন্তু এই সমস্যাগুলি যদি বারবার দেখা দেয় বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, তাহলে শুধুমাত্র বয়স কম বলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয় বলেই পরামর্শ দিয়েছেন মণিপাল হসপিটালসের ইএম বাইপাস ও সল্টলেক ক্লাস্টারের (ব্রডওয়ে ও সল্টলেক) পালমোনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দেবরাজ যশ।

তিনি বলেছেন, ‘একজন ফুসফুস বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি মনে করি, ফুসফুসের স্বাস্থ্যের প্রতি অনেক কম বয়স থেকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ পরিবেশ, জীবনযাপন এবং কর্মক্ষেত্রের নানা ধরনের প্রভাব শৈশব ও তরুণ বয়স থেকেই আমাদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।’
মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক জানিয়েছেন, ভারতে শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ থেকে তৈরি ধুলিকণা, শিল্পক্ষেত্রের নির্গমন, আবর্জনা পোড়ানো-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে তরুণ প্রজন্ম নিয়মিত দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে আসছে।
ফুসফুসের স্বাস্থ্যে কী কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
শুধু বাইরের বাতাস নয়, ঘরের বাতাসও শ্বাসযন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তামাকের ধোঁয়া, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, ধুলো এবং রান্নার সময় তৈরি হওয়া দূষণও এর কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের দূষণের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসনালিতে জ্বালা বা প্রদাহ তৈরি হতে পারে এবং হাঁপানির মতো সমস্যাও বাড়তে পারে। তবে শ্বাসযন্ত্রের রোগ সাধারণত একটি মাত্র কারণে হয় না। বংশগত প্রবণতা, অ্যালার্জি, সংক্রমণ, তামাকের সংস্পর্শ এবং জীবনযাপনের ধরন- সবকিছুই ফুসফুসের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
হাঁপানিকে হালকাভাবে নেবেন না
{{/usCountry}}হাঁপানিকে হালকাভাবে নেবেন না
{{/usCountry}}দেবরাজবাবু জানিয়েছেন, যে কোনও বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারে হাঁপানিতে। বারবার শ্বাসে সাঁই সাঁই শব্দ হওয়া, রাতে কাশি, বুকে চাপ বা ব্যায়াম করার সময় শ্বাসকষ্ট- এসবই শ্বাসনালির কোনও সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। অনেক তরুণ-তরুণী এই উপসর্গগুলির সঙ্গে খাই খাইয়ে নিয়ে জীবনযাপন করতে শুরু করেন। খেলাধুলা, সিঁড়ি ওঠা বা বেশি পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলেন, কারণ তাঁরা মনে করেন তাঁরা হয়তো যথেষ্ট শারীরিকভাবে সক্ষম নন।
কিন্তু কোনও কাজের তুলনায় শ্বাসকষ্ট যদি অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শ্বাসক্রিয়া পরীক্ষার মতো পরীক্ষার মাধ্যমে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা যায় এবং হাঁপানির মতো সমস্যাগুলি শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
ধূমপান তো বটেই, পরোক্ষ ধূমপান এখনও বড় বিপদের কারণ
মণিপাল হসপিটালসের চিকিৎসক জানিয়েছেন. শ্বাসযন্ত্রের রোগের অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য কারণ হল ধূমপান। অনেকেই মনে করেন যে মাঝেমধ্যে ধূমপান করলে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু এই ধারণা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে ফুসফুসে একাধিক ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করে।
শুধু ধূমপায়ীরাই নয়, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিশেষ করে হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসনালির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা এবং তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমানো তরুণদের ফুসফুস সুরক্ষিত রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পরিশ্রম কম, বেশি বসে থাকাও বিপদের কারণ
দেবরাজবাবু জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত ওজন শরীরের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে দৈনন্দিন সাধারণ কাজেও বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ সামগ্রিক হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের সক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শারীরিকভাবে কম সক্ষম হওয়া এবং কোনও অন্তর্নিহিত রোগের কারণে শ্বাসকষ্ট হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা অকারণ শ্বাসকষ্টকে শুধুমাত্র ব্যায়ামের অভাব বলে ধরে না নিয়ে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকিকেও উপেক্ষা করা যাবে না
চিকিৎকের মতে, নির্মাণ, উৎপাদন শিল্প, গবেষণাগার, কারখানা, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত তরুণদের নিয়মিত ধুলো, ধোঁয়া, রাসায়নিক বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসতে হয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা ও কর্মী - উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাহলে ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে তরুণ প্রজন্মের কী করা উচিত?
মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক জানিয়েছেন, ফুসফুসের যত্ন শুরু হয় প্রতিদিনের ছোটো-ছোটো অভ্যেস থেকে। ধূমপান এড়িয়ে চলা, সম্ভব হলে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ কমানো, বাড়িতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষা ব্যবহারের মতো কাজ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী কাশি, বারবার শ্বাসে সাঁই-সাঁই শব্দ, বুকে চাপ অনুভব করা বা কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই শ্বাসকষ্ট হওয়ার মতো সতর্কতামূলক লক্ষণগুলিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়।
সমস্যার শুরুতেই গুরুত্ব দিলে বিপদ কমতে পারে
একটি প্রচলিত ধারণা ভেঙে মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা শুধুমাত্র বয়স্কদেরই হয় বলে মনে করেন। বাস্তব সেটা নয়। বরং ফুসফুসের বিকাশ এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলা বিভিন্ন কারণ জীবনের অনেক আগে থেকেই জমতে শুরু করতে পারে। শৈশবের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, হাঁপানি, বায়ুদূষণ, তামাকের ধোঁয়া এবং কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শ সময়ের সঙ্গে ফুসফুসের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অবশ্যই প্রতিটি কাশি বা শ্বাসকষ্ট গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। তবে কোনও উপসর্গ বারবার দেখা দিলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুসের স্বাস্থ্যকে আজীবনের অগ্রাধিকার দিন
দেববাজবাবু বলেছেন, ‘আমাদের ফুসফুস প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অথচ কোনও সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনেক সময় ফুসফুসের স্বাস্থ্যের কথা ভাবিই না। তাই বড় কোনও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই ফুসফুসের যত্ন নেওয়া শুরু করা জরুরি। তরুণ ভারতীয়দের সুস্থ ফুসফুসের জন্য প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন বাতাস, ধোঁয়া ও দূষণের সংস্পর্শ কমানো, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রাথমিক সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা।’
সেইসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কারও বয়স কম বলেই তাঁর শ্বাসকষ্টকে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও ভালো শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।’