Sheikh Hasina: 'আমি কখন, কীভাবে...,' ভারতের পরামর্শ নয়, বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে কী জানালেন হাসিনা?
Sheikh Hasina: শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার, যে ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠন করা হয়েছিল।'
Sheikh Hasina: 'আমি কখন, কীভাবে দেশে ফিরব সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার।' নিজের দেশে ফেরা নিয়ে এমনটাই জানালেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি তিনি দ্রুতই দেশে ফিরে যাবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। গত ১৭ মে আওয়ামী লিগের এক ভার্চুয়াল সভায় দলনেত্রী শেখ হাসিনা নাম না করে তারেক রহমানের সরকারের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমার জন্য জেলখানা, ফাঁসির মঞ্চ রেডি করুন। আমার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিন। আমাকে নিয়ে যেতে বিমান পাঠান।’ ১৭ মে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লিগের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। কারণ, ৪৫ বছর আগে ওই দিনে ভারত থেকে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সি হাসিনা। দিল্লিতে সাড়ে ছয় বছর ভারত সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা হাসিনাকে দেশে ফেরার আগেই তাঁর দল আওয়ামী লিগের সভাপতি ঘোষণা করেছিল।

৪৫ বছর পর আরও এক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে সেই ভারতে অবস্থানরত হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ইদুল আজহার উৎসবের আবহেও আলোচনার ঢেউ তুলেছে ওপার বাংলায়। নেত্রীর ঘোষণায় উজ্জীবিত আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে চলছে সভা, পথসভা, মিছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢেউ উঠেছে শুভেচ্ছা বার্তার। তবে বিরূপ মন্তব্যও ধেয়ে আসছে বিএনপি সরকার ও আওয়ামী লিগ বিরোধ শিবির থেকে। পাশাপাশি জল্পনা শুরু হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা কী ভারত সরকারের পরামর্শে নিলেন? এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়াল'-এর সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট জবাব, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তারা তাদের নিজস্ব নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের সিদ্ধান্ত একান্তই তাদের, এই বিষয়ে আমার বক্তব্য প্রদান সমীচীন হবে না। তবে আমি বলতে পারি আমি কখন, কীভাবে দেশে ফিরব সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ এবং তাঁদের ভালোবাসা। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। কোন অবৈধ রায় কিংবা কোন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আমাকে রুখতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে আমি প্রস্তুত।’
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার, যে ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠন করা হয়েছিল। ইউনুসের অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনিভাবে চারবার অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনে ৩৭টি পরিবর্তন এনে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের বিচারক ও প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে সেটি কোনও বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র।’
আওয়ামী লিগ নেত্রীর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে প্রাণনাশের চেষ্টা এবং প্রত্যাবর্তন-দুটি শব্দই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর আগের দুটি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আগামী প্রত্যাবর্তনের মৌলিক ফারাক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমার নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের ভালোবাসা আমাকে বারবার শত্রুর বুলেট, গ্রেনেড ও বোমা হামলা থেকে রক্ষা করেছে। ৫ অগস্টেও আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল। আমিই ছিলাম মূল টার্গেট। কেননা আমাকে হত্যা করতে পারলে দেশবিরোধী চক্র তাদের সকল ষড়যন্ত্র সহজে বাস্তবায়ন করতে পারতো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি আবারও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে সংকট থেকে উদ্ধার করব ও গণতন্ত্র পুনুরুদ্ধার করব।’ তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, ‘১৯৮১ সালে সামরিক শাসকের (ক্ষমতায় তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা তথা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সেনা শাসক জিয়াউর রহমান) রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি প্রথমবার ফিরে এসেছিলাম। তখন আমি ছিলাম পরিবার পরিজনহারা এক নারী। কিন্তু আমাকে বরণ করে নিতে এসেছিল লক্ষ লক্ষ জনতা। আমাকে তারা তাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। সে প্রত্যাবর্তন ছিল পিতার স্বপ্নপূরণের শপথ নেওয়া এক কন্যার প্রত্যাবর্তন। ২০০৭ সালে আমি ফিরে এসেছিলাম জরুরি অবস্থার সময়, সেনা সমর্থিত সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে। সেটিও ছিল সংগ্রামের প্রত্যাবর্তন।’
এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বিশদে জানিয়েছেন তাঁর আসন্ন তৃতীয় প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও চ্যালেঞ্জ। তাঁর কথায়, ‘এবারের প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, চ্যালেঞ্জ ভিন্ন, দায়িত্বও ভিন্ন। ১৯৮১ সালে আমি ফিরেছিলাম একটি দলকে পুনর্গঠন করতে। ২০০৭ সালে ফিরেছিলাম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। এবার আমাকে ফিরতে হবে একটি দেশকে পুনর্গঠনের জন্য। কেননা অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকার দেশের প্রতিটা সেক্টর ধ্বংস করেছে। প্রতি মূহুর্তে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলন্ঠিত করছে, দেশের আবহমান সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে, জাতিকে বিভক্ত করছে।' তিনি বলেন, এবারের আগের দুটি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে এবারের প্রত্যাবর্তনের আরও এক ফারাক আছে। তাঁর কথায়, ‘১৯৮১ সালে আমি ফিরেছিলাম একজন শোকার্ত মেয়ে হিসেবে। কিন্তু এবার ফিরব একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। আমি জানি দেশের মানুষ কী চায়, আমি জানি কীভাবে তাদের সেই চাওয়া পূরণ করতে হয়। আমি জানি কীভাবে সীমিত সামর্থ নিয়েও একে পর এক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়, কীভাবে দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়। অতএব দেশ পূনর্গঠনের লক্ষ্যে আমার এবারের প্রত্যাবর্তন পরবর্তী যাত্রা কঠিন হলেও জনগনকে সঙ্গে নিয়ে আমি সেটা বাস্তবায়ন করতে পারব। দেশের জনগণও সেটি বিশ্বাস করে।’
E-Paper

