'দরকারে খসড়া ভোটার তালিকা...,' SIR ইস্যুতে কমিশনকে বার্তা সুপ্রিম কোর্টের, নজরে বাংলাও
প্রধান বিচারপতি বাংলা সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেন।
'দরকারে খসড়া ভোটার তালিকার সময়সীমা বাড়াতে হবে।' বাংলা-সহ একাধিক রাজ্যে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে মৌখিকভাবে হুঁশিয়ারি দিল সুপ্রিম কোর্ট। নতুন ভোটার তালিকা তৈরির লক্ষ্যে চালু হওয়া এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বাংলা-সহ একাধিক রাজ্যে রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির পর পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত। সেই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট ইঙ্গিত দিল, প্রয়োজনে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও বাংলায় মৃত্যু
ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্য, রাজনৈতিক দল এসআইআর-এর বিরোধিতা করে দ্বারস্থ হয়েছে শীর্ষ আদালতের। একে একে আদালতে এসেছে কেরল, সেই রাজ্যের সিপিএম-সহ অন্যান্য আরও বেশ কয়েকটি পক্ষ। মূলত এসআইআর-এর প্রক্রিয়া ও সময় নিয়ে আপত্তি জানিয়েই দায়ের হয়েছে বহু মামলা। অধিকাংশ মামলাকারীরই বক্তব্য, এসআইআর প্রক্রিয়া বড্ড তাড়াহুড়ো করে করার চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। এই মামলাগুলিরই শুনানি ছিল বুধবার। এদিন শুনানিতে নির্বাচন কমিশন শীর্ষ আদালতে জানায়, বুথস্তরের আধিকারিক (বিএলও)-রা স্বাক্ষর করে ভোটারদের থেকে এনুমারেশন ফর্ম গ্রহণ করলেই তা জমা হয়েছে বলে ধরা হবে। ডিজিটাইজেশনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। তাদের বক্তব্য, ডিজিটাইজেশন কমিশনের নিজস্ব কাজ। ডিজিটাইজেশন না হলেও ফর্ম জমা হয়েছে বলে ধরা হবে। এরপরেই নতুন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, 'আমরা শুধু এসআইআরের প্রক্রিয়াগত দিক দেখছি।' অন্যদিকে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এজলাসে জানান, যে সময়সীমার মধ্যে এসআইআর করা হচ্ছে, তাতে বিএলও-দের উপর প্রচুর চাপ তৈরি করছে। পশ্চিমবঙ্গের একজন বিএলও কাজের চাপ সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।
তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া
এদিন প্রধান বিচারপতি বাংলা সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেন। তামিলনাড়ুর মামলাগুলি পিছিয়ে দেন ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এদিকে আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে জানান, এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করা ভোটারের দায়িত্ব নয়। অনেকেই আছেন, যাঁরা নিরক্ষর। লিখতে-পড়তে জানেন না। যদি তাঁরা ফর্ম পূরণ করতে না পারেন, তাঁদের কি বাদ দিয়ে দেওয়া হবে? তাঁর বক্তব্য, নাম বাদ যেতেই পারে, কিন্তু তার জন্য যথাযথ কারণ থাকা প্রয়োজন। সিব্বলের বক্তব্য, আইন অনুসারে কোনও কিছু নথিপত্রকরণের বোঝা ভোটারদের উপর চাপানো যেতে পারে না। তখন প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, 'তার মানে আপনি বলতে চাইছেন ভোটার তালিকায় কারও নাম উঠে যাওযা মানে সেটি বৈধ। তারপরে যদি কেউ বলেন সেখানে ভুল রয়েছে, তা তাদের প্রমাণ করতে হবে। এটাই তো?' তখন সিব্বল সওয়াল করেন, 'তথ্য সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া কোনও ভাবেই দু’মাসের মধ্যে করা সম্ভব নয়।'
প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে সিব্বল আরও বলেন, 'আপনি দেশের বাস্তব চিত্রটি দেখুন। আপনার কী মনে হয় পশ্চিমবঙ্গ বা বিহারের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ জানেন কীভাবে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করতে হয়?' তখন প্রধান বিচারপতি কান্ত জানান, এর জন্য বিনা খরচে আইনি সহায়কেরা (ফ্রি লিগ্যাল ভলান্টিয়ারেরা) আছেন। তবে সিব্বলের সওয়াল, কোটি কোটি ভোটার রয়েছেন। অনেকেই ভোট দিতে গিয়ে যদি দেখেন তাঁদের নাম নেই। তাঁরা কী করবেন? সিব্বল আদালতে সওয়াল করেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া আগে কখনও দেশে হয়নি। কিন্তু তাতে আপত্তি জানান প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘আগে দেশে কখনও হয়নি’-এই মাপকাঠিতে কোনও প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা বিচার করা যায় না।
আধার কার্ড নিয়ে প্রশ্ন
আধার কার্ডের প্রসঙ্গও এদিন উঠে আসে এজলাসে। প্রধান বিচারপতি কান্ত জানান, আধার কার্ড হল এমন একটি বিষয়, যার মাধ্যমে সরকারি সুযোগসুবিধা পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, 'ধরুন কেউ প্রতিবেশী দেশের বাসিন্দা। কেউ শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। আপনারা রেশনের জন্য আধার দিচ্ছেন। এটি আমাদের সাংবিধানিক নীতির অংশ। কিন্তু শুধুমাত্র তাঁকে আধার নথি দেওয়া হয়েছে বলে কি তাঁকে এখন ভোটার হিসেবেও গণ্য করা উচিত?' অন্যদিকে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানিয়েছেন, নথিপত্র ঠিকঠাক রয়েছে কিনা, তা যাচাই করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। তিনি আরও বলেন, 'আধার কার্ড কখনোই নাগরিকত্বকে সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণ করতে পারে না। সেই কারণেই আমরা বলেছি এই তালিকার মধ্যে অন্যতম একটি নথি হতে পারে। যদি কারও নাম বাদ যায়, তবে তাঁদের নোটিস দিতে হবে।'
ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা
এদিন প্রধান বিচারপতি বলেন, 'যদি মামলাকারীরা প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে পারেন, তাহলে আমরা খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা পিছিয়ে দিতেই পারি।' সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য নির্বাচন কমিশনের জন্য হুঁশিয়ারি বলেই মনে করা হচ্ছে। শীর্ষ আদালত এদিন বুঝিয়ে দিল, কমিশন যদি বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে তাড়াহুড়ো করে, তাহলে সুপ্রিম নজরে পড়তে পারে। বৃহস্পতিবার ফের এই মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।
E-Paper

