Mukul Choudhary: বাড়ি বিক্রি, জেলযাত্রা থেকে ঋণ! বাবার অসীম আত্মত্যাগে ইডেনে ফুটল মুকুল
Mukul Choudhary: এর আগে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ম্যাচে মুকুল ছন্দ খুঁজে পাননি। সেই ম্যাচে অধিনায়ক ঋষভ পন্থ দলকে জেতান। কিন্তু ম্যাচের পর হোটেলে ফিরে আবেগ সামলাতে পারেননি মুকুল।
Mukul Choudhary: ক্রিকেটের অন্যতম জনপ্রিয় মেগা টুর্নামেন্ট আইপিএল প্রায় প্রতি মরশুমেই নতুন নতুন তারকার জন্ম দেয়। আইপিএল ২০২৬-এর ১৫ তম ম্যাচেও ঠিক সেই রকমই এক ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হওয়া ওই ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স এবং লখনউ সুপার জায়ান্টস। যেখানে লখনউয়ের তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার মুকুল চৌধুরী কেকেআর-এর বিরুদ্ধে তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংসটি খেলেছেন। যখন মুকুল ব্যাট করতে নামেন তখন ম্যাচের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ কলকাতার দিকে ছিল। ম্যাচে শেষ চার ওভারে দরকার ছিল ৫৪ রান। মুকুল একা লড়লেন। হাঁকালেন সাতটি ছয়। ২৭ বলে ৫৪ রান। শেষ বলে এল কাঙ্ক্ষিত জয়। যা মুকুল উৎসর্গ করলেন নিজের বাবাকে, যার অবদান ছাড়া তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরুই হতো না।।

অন্যদিকে, ‘মিলা নেহি কুছ ভি পল ভর মেঁ, এক দৌর ইসি মেঁ বিতা হ্যায়, বাদল বহুত সমেটে হ্যায় হামনে, তব দরিয়া বননা শিখা হ্যায়’ (এক মুহূর্তে কিছুই পাওয়া যায় না, জীবনের একটা বড় সময় কেটে যায় লড়াইয়ে। অনেক ঝড়-ঝাপটা পেরিয়েই নদী হতে শেখা যায়)-কবি সন্দীপ দ্বিবেদীর বই থেকে নেওয়া এই লাইনটিই এখন হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস রেখেছেন মুকুল চৌধুরীর বাবা দলীপ চৌধুরী। সেই সূত্র ধরেই সংবাদমাধ্যম টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করলেন, ‘এই লাইনটা আমাদের বাবা-ছেলের জীবনের গল্প বলে।’ রাজস্থানের ঝুনঝুনুর মতো ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা মুকুলের পিছনে বাবার ত্যাগ ছিল অসীম। দলীপ চৌধুরী জানিয়েছেন, ছেলকে ক্রিকেটার করতে তাঁকে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। এমনকী বিয়ের আগে থেকেই তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন, যদি তাঁর ছেলে হয়, তবে তাকে একজন ক্রিকেটার তৈরি করবেন।
চোখে জল ও প্রতিশ্রুতি
এর আগে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ম্যাচে মুকুল ছন্দ খুঁজে পাননি। সেই ম্যাচে অধিনায়ক ঋষভ পন্থ দলকে জেতান। কিন্তু ম্যাচের পর হোটেলে ফিরে আবেগ সামলাতে পারেননি মুকুল। ভিডিও কলে তাঁর লাল চোখ দেখে বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘কেঁদেছিলি?’- তিনি হেসে মাথা নাড়েন। দলীপ বলেন, ‘ও খুব হতাশ ছিল। বলছিল, এত টাকা দিয়ে দল ওকে নিয়েছে, কিন্তু ও ম্যাচ জেতাতে পারছে না। তখনই আমাকে কথা দেয়, পরের ম্যাচে সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। আর ও সেটাই করে দেখিয়েছে।’
মুকুল চৌধুরী কে?
রাজস্থানের ঝুনঝুনুর মতো ছোট গ্রামে থাকেন মুকুল চৌধুরী । ২০২৫-২৬ ঘরোয়া মরশুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নজরে আসেন মুকুল। সেই সুবাদেই সুযোগ পান আইপিএল-এ। লখনউ সুপার জায়ান্টস নিলামে তাঁকে ২.৬ কোটিতে কিনে নেয়। আর সুযোগ পেয়েই তিনি বাবাকে প্রথম প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছিলেন যে, তার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য নেওয়া ঋণ তিনি শোধ করে দেবেন। কারণ, দলীপ চৌধুরী নিজের বাড়ি বিক্রি করে দেন ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি ২০০৩ সালে স্নাতক সম্পন্ন করি, সেই বছরই আমার বিয়ে হয় এবং আমার একটি স্বপ্ন ছিল যে যদি আমার কখনও ছেলে হয়, সে ক্রিকেট খেলবে। পরের বছরই আমার একটি পুত্রসন্তান হয়, এবং খুব অল্প বয়স থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে তাকে একজন ক্রিকেটার বানানোর জন্য আমি সবকিছু করব। এত মানুষ সফল হয়, আমার ছেলে কেন পারবে না?' আর্থিক সমস্যার জন্য তাঁকে ব্যবসায় নামতে হয়, ঋণ নিতে হয়, এমন কী জেলেও যেতে হয়। আত্মীয়রা তাঁকে পাগল বলেছিলেন। কিন্তু তিনি হার মানেননি। বরং সেই কথাগুলোই তাঁকে আরও শক্ত করে দেয়।
বাবার অসীম ত্যাগ
টানা ছয় বছর ধরে রাজস্থান প্রশাসনিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন দলীপ চৌধুরী। কিন্তু পাস করতে পারেননি। এরপর তিনি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হন। তবে এত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন থেকে সরেননি তিনি। ২০১৬ সালে বাধ্য হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাঁকে। বাড়ি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সিকরের এসবিএস ক্রিকহাবে ভর্তি করেন মুকুলকে। এরপর শুরু হয় পেশাদার প্রশিক্ষণ। উদয়াস্ত পরিশ্রম। ছেলের পাশাপাশি তিনিও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। দলীপ বলেন, 'ওকে ভর্তি করার পর আমি বুঝতে পারলাম যে আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। আমার কোনও নিয়মিত আয় না থাকায় আমি আমার বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিই। আমি ২১ লক্ষ টাকা পাই। আমি ক্রেতাকে পুরো টাকাটা আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিতে বলি, যাতে সবকিছু নথিভুক্ত থাকে। পরের বছর একটা হোটেল শুরু করলাম। আরও ঋণ নিলাম। হ্যাঁ, আমি জেলেও গিয়েছি। কিন্তু কোনও প্রতারণা করিনি। কিস্তি সময়মতো দিতে পারিনি বলে এমন হয়েছে।'
আত্মীয়দের চোখে 'পাগল'
এই কঠিন সময়ে পাশে থাকার বদলে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁরা প্রত্যেকে আত্মীয়। আজ, যখন সবকিছু অনেকটাই ধাতস্থ, ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারেন না তাঁদের চেতাবনি, 'নিজের জীবন নষ্ট করেছ, এখন ছেলেকে ছেড়ে দাও।' দলীপের কথায়, 'ওদের প্রত্যেকটা কথা আমাকে আরও শক্ত করেছে। মনে হয়েছে, আমি ঠিক পথেই আছি।' আত্মীয়রা সঙ্গ না দিলেও পরিবার হাত ছাড়েনি। সকলে মিলেজুলে এগিয়ে গিয়েছেন।
E-Paper

