মৃত শিকারিদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় এই পাহাড়ে! জানেন কি আইরি ভূতের কাহিনি? পড়ে নিন গা ছমছমে গল্প

কে এই আইরি ভূত? ভয়ঙ্কর কেউ? নাকি পাহাড়ি কোনও দেবতা? গল্পটা নিজে পড়ে নিন। 

Published on: Mar 03, 2026 1:48 PM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি জনপদ কুমায়ুন তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আদিম রহস্য এবং লোককথার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। হিমালয়ের এই অঞ্চলে প্রচলিত অসংখ্য দেব-দেবী ও অতিলৌকিক কাহিনির মধ্যে সবথেকে শিহরণ জাগানো চরিত্র হল 'আইরি' (Airi)। আইরি কেবল একজন সাধারণ ভূত নয়, কুমায়ুনি লোকবিশ্বাসে সে এক শক্তিশালী ব্যাধ বা শিকারি প্রেতাত্মা।

মৃত শিকারিদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় এই পাহাড়ে! জানেন কি আইরি ভূতের কাহিনি? পড়ে নিন গা ছমছমে গল্প
মৃত শিকারিদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় এই পাহাড়ে! জানেন কি আইরি ভূতের কাহিনি? পড়ে নিন গা ছমছমে গল্প

কুমায়ুনের এই রহস্যময় শিকারি ভূত 'আইরি'-র ইতিহাস এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকগাথা সম্পর্কে আজ জেনে নিন।

হিমালয়ের গভীর অরণ্যে যখন রাত নামে, তখন কুমায়ুনের বয়োজ্যেষ্ঠরা সতর্ক করে দেন— ভুলেও যেন কোনো শিস বা অদ্ভুত শব্দের উত্তর না দেওয়া হয়। তাঁদের বিশ্বাস, বনের নির্জনতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে 'আইরি'। লোককথা অনুযায়ী, আইরি হলো সেইসব শিকারিদের আত্মা, যাঁরা শিকারে গিয়ে বন্য পশুর আক্রমণ বা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। যেহেতু তাঁদের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা হিংস্রতা ও শিকারের নেশায় মত্ত ছিলেন, তাই তাঁরা পরলোকে শান্তি না পেয়ে 'আইরি' ভূত হিসেবে পৃথিবীতেই রয়ে যান।

(আরও পড়ুন: মিজোরামের মারাল্যান্ডে লুকিয়ে আছে এক রহস্য়ময় প্রেতাত্মার কাহিনি! সেই আহমাও-এর গল্প শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে)

আইরি-র অবয়ব ও বৈশিষ্ট্য

কুমায়ুনি বর্ণনা অনুযায়ী, আইরি ভূত দেখতে অত্যন্ত দীর্ঘকায় এবং তার হাতে থাকে ধনুক ও তূণ। অনেক সময় তাকে ঘোড়ায় সওয়ার অবস্থায় দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকে একদল অদৃশ্য শিকারি কুকুর, যাদের ডাক রাতের নির্জনতায় গ্রামবাসীদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করে। কথিত আছে, আইরি-র চোখ সবসময় জ্বলজ্বল করে এবং তার গলার আওয়াজ পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তৈরি করে।

আইরি-র লোকগাথা ও ইতিহাস

আইরি-র ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন ধারা পাওয়া যায়:

১. শিকারি প্রেতাত্মা: সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো শিকারি যদি বনে মারা যান এবং তাঁর যথাযথ অন্ত্যেষ্টি না হয়, তবে তিনি আইরি হয়ে যান। তিনি বনে ঘুরে বেড়ান এবং জীবিত শিকারিদের পথ ভুলিয়ে বিপদে ফেলেন।

২. শিকারের দেবতা (The Hunter God): অনেক গ্রামে আইরি-কে কেবল ভূত নয়, বরং শিকারের দেবতা হিসেবেও পুজো করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শিকারে যাওয়ার আগে আইরি-র আশীর্বাদ নিলে বড় পশু শিকার করা সহজ হয়। অনেক জায়গায় তাঁর নামে ছোট ছোট পাথরের মন্দির বা 'থান' দেখা যায়।

(আরও পড়ুন: একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর এবং করুণ ভূত ‘আভি’! তার ইতিহাস ও লোককথা শুনলে চমকে যাবেন)

আইরি-র অভিশাপ ও সতর্কতা

কুমায়ুনিদের বিশ্বাস, কেউ যদি রাতে আইরি-র মুখোমুখি হয় বা তার শিকারি কুকুরের ডাক শোনে, তবে তার অমঙ্গল অনিবার্য। আইরি-র ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত অদৃশ্য তির যে কোনো মানুষকে অসুস্থ বা জ্ঞানহীন করে দিতে পারে। এমনকি আইরি যদি কারো নাম ধরে ডাকে এবং সেই ব্যক্তি উত্তর দেয়, তবে সে ব্যক্তি আইরি-র মায়াজালে আটকা পড়ে বনের গহীনে হারিয়ে যায়।

তবে আইরি কেবল ভয়ংকর নয়, সে ন্যায়পরায়ণও বটে। যারা বনের পরিবেশ নষ্ট করে বা অকারণে পশু হত্যা করে, আইরি তাঁদের শাস্তি দেয় বলে গ্রাম্য প্রধানরা মনে করেন। তাই অনেক সময় আইরি-কে বনের রক্ষক হিসেবেও গণ্য করা হয়।

(আরও পড়ুন: মহাদেবের তৃতীয় চোখের আগুনে এদিন পুড়ে গিয়েছিলেন কামদেব! কেন দোলের দিনেই এমন ঘটনা ঘটেছিল)

আধুনিক প্রেক্ষাপট ও সংস্কৃতি

বর্তমানে পাহাড়ের জীবন অনেক বদলে গেলেও আইরি-র গল্প আজও কুমায়ুনি বয়স্কদের মুখে মুখে ঘোরে। স্থানীয় 'জাগড়' (এক ধরনের তান্ত্রিক অনুষ্ঠান) চলাকালীন ওঝারা আইরি-কে আহ্বান জানান যাতে সে গ্রামের গবাদি পশু এবং বাসিন্দাদের রক্ষা করে। উত্তরাখণ্ডের এই সমৃদ্ধ লোকগাথা আজও মানুষের মনে ভীতি এবং শ্রদ্ধা—দুটিই সমানভাবে বজায় রেখেছে।

(আরও পড়ুন: দোলযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন কংসের প্রিয় অনুচরকে, নদীর ঘাটে সেদিন কী ঘটেছিল)

আইরি কেবল একটি ভৌতিক গল্প নয়, এটি হিমালয়ের রুক্ষ জীবন এবং বন্য প্রকৃতির সাথে মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের এক প্রতিফলন। যারা অকালে ঝরে গেছেন, তাঁদের স্মৃতিকে ভয় আর ভক্তির মিশেলে বাঁচিয়ে রাখার এক অদ্ভুত মাধ্যম হলো এই আইরি। কুমায়ুনের গভীর রাতে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আজও যখন কুকুরের ডাক শোনা যায়, পাহাড়িরা মনে করেন—আইরি হয়তো আবারও শিকারে বেরিয়েছে।