হিন্দু পুরাণের এক অত্যন্ত রহস্যময়ী এবং অজেয় দেবী হলেন ভ্রমরী দেবী। তিনি দেবী পার্বতীর এক বিশেষ অবতার, যাঁকে 'মৌমাছিদের দেবী' হিসেবে গণ্য করা হয়। শক্তিবাদ এবং তন্ত্রশাস্ত্রে তাঁর স্থান অত্যন্ত উচ্চে। কথিত আছে, যখন স্বর্গ ও মর্ত্য এক অজেয় রাক্ষসের অত্যাচারে দগ্ধ হচ্ছিল, তখন দেবী পার্বতী এই ভয়ংকর অথচ অদ্ভুত রূপ ধারণ করেছিলেন।

দেবী ভ্রমরীর উৎপত্তি, অরুণাসুর বধের রোমহর্ষক কাহিনি এবং তাঁর উপাসনার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আজ জেনে নিন। কেন অরুণাসুর বধের জন্য দেবী পার্বতী এই রূপ নিয়েছিলেন, সেটিও জানুন।
দেবী ভ্রমরী মূলত আদি পরাশক্তির সেই রূপ, যা প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম জীব—মৌমাছির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। তাঁর নাম ‘ভ্রমরী’ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ভ্রমর’ থেকে। তিনি কেবল একজন দেবী নন, তিনি প্রকৃতির সেই ভারসাম্য যা দুষ্টের দমনে যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারে।
(আরও পড়ুন: দেবী ছিন্নমস্তাকে অনেকেই প্রচণ্ড ভয় পান! তাঁর এই রুদ্র রূপের কারণ কী? কী তাঁর কাহিনি)
অরুণাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনি
পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, অরুণাসুর নামক এক শক্তিশালী রাক্ষস ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করে এক অদ্ভুত বর লাভ করেছিলেন। বরটি ছিল— কোনো দুই পা বিশিষ্ট বা চার পা বিশিষ্ট প্রাণী তাকে বধ করতে পারবে না। এছাড়া কোনো অস্ত্র বা শাস্ত্র দিয়েও তাকে মারা অসম্ভব ছিল। এই বরের অহংকারে অরুণাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেন এবং ঋষিদের যজ্ঞ পণ্ড করতে শুরু করেন।
দেবতারা নিরুপায় হয়ে দেবী আদিশক্তির শরণাপন্ন হন। দেবী পার্বতী তখন এক বিশেষ পরিকল্পনা করেন। যেহেতু বর অনুযায়ী কোনো মানুষ (দুই পা) বা পশু (চার পা) তাকে মারতে পারবে না, তাই দেবী অসংখ্য 'ছয় পা' বিশিষ্ট ভ্রমর বা মৌমাছির রূপ ধারণ করেন। তাঁর দেহ থেকে কোটি কোটি কালো ভ্রমর নির্গত হতে শুরু করে। দেবী নিজে একটি বিশাল ভ্রমরের রূপ নেন এবং অরুণাসুরের ওপর আক্রমণ করেন। ভ্রমরদের হুলের আঘাতে এবং তাদের সম্মিলিত গুঞ্জনে অরুণাসুরের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই সৃষ্টি রক্ষা পায় এবং দেবী ‘ভ্রমরী’ নামে পূজিতা হন।
{{/usCountry}}দেবতারা নিরুপায় হয়ে দেবী আদিশক্তির শরণাপন্ন হন। দেবী পার্বতী তখন এক বিশেষ পরিকল্পনা করেন। যেহেতু বর অনুযায়ী কোনো মানুষ (দুই পা) বা পশু (চার পা) তাকে মারতে পারবে না, তাই দেবী অসংখ্য 'ছয় পা' বিশিষ্ট ভ্রমর বা মৌমাছির রূপ ধারণ করেন। তাঁর দেহ থেকে কোটি কোটি কালো ভ্রমর নির্গত হতে শুরু করে। দেবী নিজে একটি বিশাল ভ্রমরের রূপ নেন এবং অরুণাসুরের ওপর আক্রমণ করেন। ভ্রমরদের হুলের আঘাতে এবং তাদের সম্মিলিত গুঞ্জনে অরুণাসুরের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই সৃষ্টি রক্ষা পায় এবং দেবী ‘ভ্রমরী’ নামে পূজিতা হন।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: মনে করা হয়, তিনি ব্রহ্মবিদ্যার প্রতীক, সত্যের পথ দেখান! কে এই দেবী বিশালাক্ষী? কী তাঁর কাহিনি)
তন্ত্রশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং শক্তিবাদ কী বলছে?
শক্তিবাদ: শক্তিবাদে দেবী ভ্রমরীকে প্রকৃতির সংহারক ও পালক—উভয় রূপেই দেখা হয়। তিনি প্রমাণ করেন যে শক্তি কেবল বিশালতায় নেই, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবের মধ্যেও ব্রহ্মাণ্ডের শক্তি নিহিত থাকতে পারে।
তন্ত্রশাস্ত্র: তন্ত্রে ভ্রমরী দেবীর উপাসনা অত্যন্ত গুহ্য। বলা হয়, শরীরের সাতটি চক্রের মধ্যে যখন কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়, তখন এক প্রকার গুঞ্জন শব্দ শোনা যায়, যাকে ‘ভ্রমর গুঞ্জন’ বলা হয়। তান্ত্রিক সাধনায় একে 'ভ্রমরী প্রাণায়াম' বা নাদ সাধনার সাথে যুক্ত করা হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্র: জ্যোতিষ মতে, যাদের কুণ্ডলীতে রাহু বা শনির অশুভ প্রভাবের কারণে মানসিক অস্থিরতা বা শত্রু ভয় থাকে, তাঁদের দেবী ভ্রমরীর আরাধনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি শত্রুর বিনাশ এবং মনের শান্তি ফেরাতে অদ্বিতীয়।
(আরও পড়ুন: অত্যন্ত রহস্যময়ী এবং শক্তিশালী দেবী কাটেরি আম্মান, তাঁকে সকলে এত ভয় পান কেন? কী বলছে তন্ত্রশাস্ত্র)
দেবী ভ্রমরীর পুজোর নিয়ম ও সতর্কতা
দেবী ভ্রমরীর পুজো করার সময় কিছু বিশেষ বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন:
১. গুঞ্জন ভক্তি: তাঁর আরাধনায় মৌমাছির শব্দের মতো গুঞ্জন করে মন্ত্র পাঠ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
২. নিবেদন: দেবীকে সাধারণত মধু এবং পুষ্প অর্পণ করা হয়। কারণ মধু মৌমাছিদের সারাংশ এবং এটি দেবীর অত্যন্ত প্রিয়।
৩. ভ্রমরী প্রাণায়াম: পুজোর সময় ভ্রমরী প্রাণায়াম করলে দেবীর আশীর্বাদ দ্রুত পাওয়া যায় এবং মানসিক একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।
৪. সতর্কতা: দেবীর এই রূপটি অত্যন্ত তেজস্বী। তাই পুজোর সময় মনে কোনো প্রকার হিংসা বা অহংকার রাখা উচিত নয়। তাঁর ক্রোধ অরুণাসুরের মতো অহংকারীকে বিনাশ করে।
(আরও পড়ুন: নাম শুনলে সাধারণ মানুষ আজও শিউরে ওঠেন, কে এই দেবী নিঋতি? কেন তাঁকে ঘিরে এত আতঙ্ক)
দেবী ভ্রমরী আমাদের শেখান যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিই হলো শ্রেষ্ঠ শক্তি। কোটি কোটি মৌমাছির মতো যখন আমরা একজোট হই, তখন যেকোনো অজেয় বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। উত্তরাখণ্ডের আদি কৈলাস যাত্রা বা বিভিন্ন শক্তিপীঠে দেবী ভ্রমরীর উপস্থিতি আজও ভক্তদের মনে এক অলৌকিক আশার আলো জাগিয়ে রাখে।