দেবী ছিন্নমস্তাকে অনেকেই প্রচণ্ড ভয় পান! তাঁর এই রুদ্র রূপের কারণ কী? কী তাঁর কাহিনি

শক্তিবাদে ছিন্নমস্তা হলেন 'আত্মবলিদান' এবং 'কুণ্ডলিনী শক্তির' প্রতীক। তাঁর কবন্ধ থেকে নির্গত তিনটি রক্তধারা হলো পিঙ্গলা, ইড়া এবং সুষুম্না নাড়ী।

Published on: Feb 24, 2026 9:51 AM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দশমহাবিদ্যার ষষ্ঠ মহাবিদ্যা হলেন দেবী ছিন্নমস্তা। তাঁর রূপ যেমন ভয়ংকর, তেমনই গভীর তাঁর দার্শনিক তাৎপর্য। তন্ত্রশাস্ত্রে তাঁকে 'প্রচণ্ড চণ্ডিকা' বলা হয়। ছিন্নমস্তা শব্দের অর্থ— যাঁর মস্তক ছিন্ন বা কাটা। দেবী নিজের মস্তক নিজেই ছিন্ন করে নিজেরই রক্ত পান করছেন— এই অদ্ভুত ও বীভৎস রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের গূঢ় রহস্য।

দেবী ছিন্নমস্তাকে অনেকেই প্রচণ্ড ভয় পান! তাঁর এই রুদ্র রূপের কারণ কী? কী তাঁর কাহিনি
দেবী ছিন্নমস্তাকে অনেকেই প্রচণ্ড ভয় পান! তাঁর এই রুদ্র রূপের কারণ কী? কী তাঁর কাহিনি

দেবী ছিন্নমস্তার পরিচয়, তাঁর পৌরাণিক কাহিনি এবং পূজাবিধি জেনে নিন। ছিন্ন মস্তকে রক্তপানকারী এক রহস্যময়ী মহাবিদ্যার দেবীর পুজো কেন গৃহস্থের জন্য অত্যন্ত কঠিন, সেটিও জেনে রাখুন।

ভারতীয় শক্তিবাদ এবং তন্ত্রশাস্ত্রে দেবী ছিন্নমস্তা এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর মূর্তিকল্পে দেখা যায়, দেবী নগ্নিকা, তাঁর কবন্ধ (গলা) থেকে তিনটি রক্তের ধারা নির্গত হচ্ছে। মাঝখানের ধারাটি দেবী নিজের ছিন্ন মস্তক দিয়ে পান করছেন এবং বাকি দুটি ধারা তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়া (ডাকিনী ও বর্ণিনী) পান করছেন। দেবীর পায়ের নিচে রতি ও কামদেবকে আলিঙ্গনরত অবস্থায় দেখা যায়।

পৌরাণিক কাহিনি: কেন নিজের মস্তক ছিন্ন করলেন দেবী?

পুরাণ ও তন্ত্র গ্রন্থ অনুযায়ী, একবার দেবী পার্বতী মন্দাকিনী নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুই সখী— ডাকিনী ও বর্ণিনী। স্নান শেষে দেবীর দুই সখী প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন এবং দেবীর কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন। দেবী তাঁদের অপেক্ষা করতে বলেন, কিন্তু ক্ষুধার জ্বালায় সখীরা বারবার আর্তি জানাতে থাকেন। অবশেষে করুণাময়ী মাতা নিজের নখ দিয়ে নিজের মস্তক ছিন্ন করেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনটি রক্তের ধারা নির্গত হয়, যা দিয়ে তিনি তাঁর সখীদের ও নিজের ক্ষুধা নিবারণ করেন। এই কাহিনিটি পরম ত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।

শক্তিবাদ ও তন্ত্রশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি

শক্তিবাদে ছিন্নমস্তা হলেন 'আত্মবলিদান' এবং 'কুণ্ডলিনী শক্তির' প্রতীক। তাঁর কবন্ধ থেকে নির্গত তিনটি রক্তধারা হলো পিঙ্গলা, ইড়া এবং সুষুম্না নাড়ী। নিজের মস্তক ছিন্ন করার অর্থ হলো— অহং এবং মনের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া। পায়ের নিচে কামদেব ও রতির অবস্থান নির্দেশ করে যে, দেবী কামনার ওপর নিয়ন্ত্রণ জয় করেছেন। তিনি একাধারে জীবনদাত্রী (রক্ত পান করাচ্ছেন) এবং সংহারকারিণী (নিজের মাথা কাটছেন)।

জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবী ছিন্নমস্তা

জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবী ছিন্নমস্তাকে রাহু (Rahu) গ্রহের অধিপতি দেবী হিসেবে মানা হয়। যাঁদের কুণ্ডলীতে রাহু অশুভ অবস্থানে থাকে বা কালসর্প দোষ থাকে, তাঁদের ছিন্নমস্তা স্তোত্র পাঠ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি রাহুর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে জাতককে অসীম সাহস ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধি প্রদান করেন।

পূজার সময়ে পালনীয় নিয়ম ও ভয়ের কারণ

দেবী ছিন্নমস্তাকে কেন সকলে ভয় পান? এর প্রধান কারণ তাঁর প্রচণ্ড রূপ এবং উগ্র স্বভাব। শাস্ত্রমতে, তাঁর সাধনা অত্যন্ত কঠিন এবং সামান্য ভুলেও হিতে বিপরীত হতে পারে।

গৃহস্থের জন্য বিধি: সাধারণত গৃহস্থ বাড়িতে দেবীর এই রূপের পূজা করা নিষিদ্ধ। কেবল তান্ত্রিক বা বিশেষ সাধকরাই উপযুক্ত গুরু নির্দেশনায় তাঁর পূজা করেন।

  • পবিত্রতা: এই পূজায় কঠোর ব্রহ্মচর্য এবং মানসিক পবিত্রতা প্রয়োজন।
  • নির্জনতা: জনশূণ্য স্থান বা শ্মশানেই তাঁর সাধনা বেশি ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।

ভুল পদ্ধতিতে বা অপবিত্র মনে তাঁর পুজো করলে সাধকের মানসিক বিপর্যয় বা শারীরিক ক্ষতি হতে পারে বলেই সাধারণ মানুষ তাঁকে সমীহ ও ভয় করে চলেন।