সনাতন ধর্মে দেবী শক্তির অসংখ্য রূপের মধ্যে অন্যতম এক করুণাময়ী ও তেজস্বিনী রূপ হলেন দেবী বিশালাক্ষী। কাশীর ৫১ পীঠের অন্যতম এই দেবী মূলত মা অন্নপূর্ণারই এক বিশেষ স্বরূপ। 'বিশালাক্ষী' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো— 'যাঁর বিশাল বা আয়ত লোচন (চোখ)'। তাঁর দৃষ্টিতে যেমন সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি মমতা ঝরে পড়ে, তেমনই অশুভ শক্তির বিনাশে সেই দৃষ্টিই হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ।

দেবী বিশালাক্ষীর পরিচয়, তাঁর পৌরাণিক কাহিনি এবং পূজাবিধি অনেকেই জানেন না। কাশীর পবিত্র মহাপীঠ ও শক্তির অপার মহিমা, তাঁর পৌরাণিক ইতিহাস ও পূজার গূঢ় নিয়ম জেনে নিন এখান থেকে।
বারাণসী বা কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের অদূরে মণিকর্ণিকা ঘাটের কাছে অবস্থিত দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির। দেবী ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণ অনুযায়ী, এটি একটি সতীপীঠ। শক্তির উপাসকদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব কামাখ্যা বা কালীঘাটের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
বিশালাক্ষী দেবীর পৌরাণিক কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, যখন ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবী সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করেছিলেন, তখন এই পুণ্যভূমি কাশীতে দেবীর কর্ণকুণ্ডল (কানের অলঙ্কার) বা কোনো কোনো মতে তাঁর অক্ষি (চোখ) পতিত হয়েছিল। তাই এই স্থানটি ৫১ পীঠের অন্যতম।
আবার অন্য একটি কাহিনি অনুসারে, দেবী বিশালাক্ষী হলেন মা অন্নপূর্ণারই এক রূপ। দেবী অন্নপূর্ণা যেমন জগতের ক্ষুধা নিবারণ করেন, বিশালাক্ষী রূপ ধরে তিনি তেমনই ভক্তদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেন। লোকগাথা আছে যে, দেবী বিশালাক্ষী ব্যাসদেবকে কাশীতে থাকাকালীন অন্নদান করে তাঁর পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং পরে তাঁকে পরম জ্ঞান দান করেছিলেন।
শক্তিবাদ ও তন্ত্রশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
শক্তিবাদে দেবী বিশালাক্ষীকে 'ব্রহ্মবিদ্যার' প্রতীক মনে করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি 'নবদুর্গা' বা 'দশমহাবিদ্যা'র প্রত্যক্ষ রূপ না হলেও, তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়ার এক অত্যন্ত জাগ্রত স্বরূপ। তান্ত্রিক সাধনায় দেবীর নাম নেওয়া হয় 'বিমলদাত্রী' হিসেবে, যিনি সাধকের মন থেকে মায়া ও মোহ দূর করে সত্যের পথ দেখান। বিশালাক্ষী স্তোত্রে তাঁর রূপকে বর্ণনা করা হয়েছে যা অত্যন্ত শান্ত অথচ প্রভাবশালী।
জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবী বিশালাক্ষী
{{/usCountry}}শক্তিবাদে দেবী বিশালাক্ষীকে 'ব্রহ্মবিদ্যার' প্রতীক মনে করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি 'নবদুর্গা' বা 'দশমহাবিদ্যা'র প্রত্যক্ষ রূপ না হলেও, তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়ার এক অত্যন্ত জাগ্রত স্বরূপ। তান্ত্রিক সাধনায় দেবীর নাম নেওয়া হয় 'বিমলদাত্রী' হিসেবে, যিনি সাধকের মন থেকে মায়া ও মোহ দূর করে সত্যের পথ দেখান। বিশালাক্ষী স্তোত্রে তাঁর রূপকে বর্ণনা করা হয়েছে যা অত্যন্ত শান্ত অথচ প্রভাবশালী।
জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবী বিশালাক্ষী
{{/usCountry}}জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, দেবী বিশালাক্ষীর আরাধনা মূলত শুক্র (Venus) এবং চন্দ্র (Moon) গ্রহের অশুভ প্রভাব কাটাতে সাহায্য করে।
- যাঁদের কুষ্ঠিতে চোখের সমস্যা বা দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা রয়েছে, তাঁদের এই দেবীর পুজো করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
- বিশালাক্ষী দেবীর আশীর্বাদ মানুষের দাম্পত্য জীবনে সুখ ফিরিয়ে আনে এবং মানসিক অস্থিরতা দূর করে শান্তি প্রদান করে।
পূজার সময়ে পালনীয় নিয়ম ও বিশেষ সতর্কতা
দেবী বিশালাক্ষীর পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করতে হয়। এই পুজোর সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
- ১. শুদ্ধি: পুজোর আগে গঙ্গাস্নান বা পবিত্র জলে স্নান করে শুদ্ধ হওয়া আবশ্যক।
- ২. নৈবেদ্য: দেবীকে মূলত পরমান্ন (পায়েস) এবং ফল নিবেদন করা হয়। এছাড়া লাল ফুল ও সিঁদুর তাঁর অত্যন্ত প্রিয়।
- ৩. কুমারী পূজা: বিশালাক্ষী মন্দিরে কুমারী পূজা করার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। মনে করা হয়, ছোট শিশুদের মধ্যে দেবী স্বয়ং বিরাজ করেন।
- ৪. চক্ষুদান: অনেক ভক্ত দেবীর মূর্তিতে রূপোর চোখ বা অলঙ্কার অর্পণ করেন, যা পরিবারের কল্যাণ ও রোগমুক্তির প্রতীক।
কেন তাঁকে দর্শন করা জরুরি?
কাশী খণ্ড অনুযায়ী, কাশীতে বিশ্বনাথ দর্শনের পর যদি বিশালাক্ষী দর্শন না করা হয়, তবে তীর্থযাত্রার পূর্ণ ফল লাভ হয় না। তিনি ভক্তদের সব ধরণের শোক ও তাপ থেকে মুক্তি দেন বলেই তাঁকে 'বিশালাক্ষী'র পাশাপাশি 'সর্বজনপ্রিয়া' বলা হয়।