...
...
Next Story

ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন

দোলযাত্রার আগের রাতে হয় ন্যাড়াপোড়া বা চাঁচর। এর কারণ কী? ন্যাড়াপোড়া নামটাই বা এল কোথা থেকে? জেনে নিন।

Published on: Mar 02, 2026 12:38 PM IST
By
Prefer HTon Google
Advertisement

বসন্তের রঙের উৎসব দোলযাত্রার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় বাংলার গ্রামগঞ্জে এবং শহরের আনাচে-কানাচে খড়কুটো, বাঁশ আর শুকনো ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালানোর এক চিরাচরিত দৃশ্য চোখে পড়ে। একে আমরা বলি 'ন্যাড়াপোড়া' বা 'চাঁচর'। উত্তর ভারতে যা 'হোলিকা দহন' নামে পরিচিত, বাংলায় তার রূপটি অনেকটা লৌকিক এবং কৃষিভিত্তিক।

ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন
ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন

ন্যাড়াপোড়া এবং চাঁচরের ইতিহাস, নামকরণের কারণ এবং এর পেছনের লোকবিশ্বাস অনেকেই জানেন না। বিশেষ করে ন্যাড়াপোড়া শব্দ নিয়ে তো খুবই কৌতুহল আছে অনেকের মধ্যে। জেনে নিন, কেন দোলযাত্রার আগে আগুনের এই উদযাপন হয়?

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দোলযাত্রা। এই উৎসবের সূচনা হয় আগুনের শিখায় অশুভকে ভস্মীভূত করার মাধ্যমে। কোথাও একে বলা হয় ন্যাড়াপোড়া, কোথাও চাঁচর, আবার কোথাও বা 'বুড়ির ঘর' পোড়ানো। তবে নাম যাই হোক, এর মূল সুরটি হলো— পুরনো জঞ্জাল পুড়িয়ে নতুনের আবাহন।

(আরও পড়ুন: আগামিকাল দোলযাত্রা, প্রিয়জনদের রঙের উৎসবের শুভেচ্ছা জানান আজই, কী লিখবেন জেনে নিন)

নামকরণের ইতিহাস

'ন্যাড়াপোড়া' এবং 'চাঁচর'—এই দুটি শব্দই বাংলার মাটির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে।

  • ন্যাড়াপোড়া: 'ন্যাড়া' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কেশহীন বা মসৃণ। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি থেকে পুরনো শুকনো পাতা ঝরে গিয়ে গাছগুলো যেমন ন্যাড়া হয়ে যায়, ঠিক তেমনই মানুষের মনের ভেতরের মলিনতা ও 'ন্যাড়া' ভাবকে আগুনের শিখায় পুড়িয়ে নতুন পত্রপল্লব বা সদ্গুণের উদয় ঘটানোর প্রতীক হলো ন্যাড়াপোড়া। লোকমুখে শোনা যায়, অশুভ অসুর বা অপদেবতার মাথা মুড়িয়ে বা 'ন্যাড়া' করে তাকে আগুনের শিখায় দণ্ড দেওয়া থেকেই এই নামের উৎপত্তি।
  • চাঁচর: 'চাঁচর' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'চঞ্চু' বা খড়কুটোর স্তূপ থেকে। আবার অনেকের মতে, মৃত্তিকাসংলগ্ন আগাছা বা শুকনো লতাপাতা পরিষ্কার করা বা 'চাঁছা' থেকেই চাঁচর শব্দের জন্ম। মূলত শুকনো ডালপালা ও খড় দিয়ে তৈরি ঘরকে চাঁচর ঘর বলা হয়।

পৌরাণিক এবং বৈজ্ঞানিক—উভয় দিক থেকেই এই প্রথার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে:

১. পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: ভাগবত পুরাণ অনুসারে, এই দিনেই ভক্ত প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টাকালে হিরণ্যকশিপুর বোন 'হোলিকা' আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ রক্ষা পান। এই ঘটনাটি অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তাই অশুভকে দহন করার এই প্রথা দোলের আগের রাতে পালিত হয়।

২. ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব: বসন্তকাল মানেই শীতের বিদায় এবং গরমের শুরু। এই সময় প্রকৃতিতে প্রচুর শুকনো পাতা ও ডাল জমা হয়। প্রাচীনকালে কৃষিভিত্তিক সমাজে মাঠ পরিষ্কার করার জন্য এই আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলা হতো। আবার আগুনের ধোঁয়া পরিবেশে থাকা বসন্তকালীন অনেক ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে।

৩. শুদ্ধিকরণ: আগুনের ধর্ম হলো পুড়িয়ে শুদ্ধ করা। মানুষের ভেতরের ইর্ষা, দ্বেষ ও কলুষতা পুড়িয়ে ফেলে পরদিন আবিরের পবিত্র রঙে একে অপরকে রাঙিয়ে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিই হলো এই ন্যাড়াপোড়া।

(আরও পড়ুন: কর্ণের কথা তো জানেন, কিন্তু তাঁর পুত্র বৃষসেনের কথা জানেন কি? তাঁর মৃত্যু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্যতম ট্র্যাজিক মুহূর্ত)

পালনের পদ্ধতি ও লোকবিশ্বাস

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ন্যাড়াপোড়া পালনের ভিন্ন ভিন্ন রীতি আছে। কোথাও শুকনো বাঁশের ওপর খড় দিয়ে মানুষের মতো আকৃতি তৈরি করা হয়, যাকে বলা হয় 'মেড়া'। কোথাও আবার ভেড়া বা কুঁড়েঘরের আদল তৈরি করা হয়। আগুন জ্বালানোর পর সেই আগুনের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে বলা হয়— "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল / পূর্ণিমাতে কৃষ্ণ নাচে, মুখে হরিবোল!" দগ্ধ হওয়া আগুন থেকে পোড়া খড় বা বাঁশ নিয়ে কৃষি জমিতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথাও অনেক জায়গায় প্রচলিত, যাতে ফলন ভালো হয়।

(আরও পড়ুন: হোলিকা দহনের দিনে কী ঘটেছিল? কীভাবে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান ভক্ত প্রহ্লাদ, জেনে নিন সেই গল্প)

ন্যাড়াপোড়া বা চাঁচর কেবল একটি আগুনের উৎসব নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটি আমাদের শেখায় যে, নতুনকে বরণ করতে হলে পুরনো জঞ্জালকে ত্যাগ করতে হয়। আগুনের এই লেলিহান শিখা যেমন সমস্ত অন্ধকার গ্রাস করে নেয়, তেমনই দোল উৎসবের রঙ আমাদের জীবনে সাম্য ও মৈত্রীর বার্তা বয়ে নিয়ে আসে।

 
ABOUT THE AUTHOR
Suman Roy

সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।

SHARE THIS ARTICLE ON
Hindustantimes wants to start sending you push notifications. Click allow to subscribe