বসন্তের রঙের উৎসব দোলযাত্রার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় বাংলার গ্রামগঞ্জে এবং শহরের আনাচে-কানাচে খড়কুটো, বাঁশ আর শুকনো ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালানোর এক চিরাচরিত দৃশ্য চোখে পড়ে। একে আমরা বলি 'ন্যাড়াপোড়া' বা 'চাঁচর'। উত্তর ভারতে যা 'হোলিকা দহন' নামে পরিচিত, বাংলায় তার রূপটি অনেকটা লৌকিক এবং কৃষিভিত্তিক।

ন্যাড়াপোড়া এবং চাঁচরের ইতিহাস, নামকরণের কারণ এবং এর পেছনের লোকবিশ্বাস অনেকেই জানেন না। বিশেষ করে ন্যাড়াপোড়া শব্দ নিয়ে তো খুবই কৌতুহল আছে অনেকের মধ্যে। জেনে নিন, কেন দোলযাত্রার আগে আগুনের এই উদযাপন হয়?
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দোলযাত্রা। এই উৎসবের সূচনা হয় আগুনের শিখায় অশুভকে ভস্মীভূত করার মাধ্যমে। কোথাও একে বলা হয় ন্যাড়াপোড়া, কোথাও চাঁচর, আবার কোথাও বা 'বুড়ির ঘর' পোড়ানো। তবে নাম যাই হোক, এর মূল সুরটি হলো— পুরনো জঞ্জাল পুড়িয়ে নতুনের আবাহন।
(আরও পড়ুন: আগামিকাল দোলযাত্রা, প্রিয়জনদের রঙের উৎসবের শুভেচ্ছা জানান আজই, কী লিখবেন জেনে নিন)
নামকরণের ইতিহাস
'ন্যাড়াপোড়া' এবং 'চাঁচর'—এই দুটি শব্দই বাংলার মাটির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে।
- ন্যাড়াপোড়া: 'ন্যাড়া' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কেশহীন বা মসৃণ। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি থেকে পুরনো শুকনো পাতা ঝরে গিয়ে গাছগুলো যেমন ন্যাড়া হয়ে যায়, ঠিক তেমনই মানুষের মনের ভেতরের মলিনতা ও 'ন্যাড়া' ভাবকে আগুনের শিখায় পুড়িয়ে নতুন পত্রপল্লব বা সদ্গুণের উদয় ঘটানোর প্রতীক হলো ন্যাড়াপোড়া। লোকমুখে শোনা যায়, অশুভ অসুর বা অপদেবতার মাথা মুড়িয়ে বা 'ন্যাড়া' করে তাকে আগুনের শিখায় দণ্ড দেওয়া থেকেই এই নামের উৎপত্তি।
- চাঁচর: 'চাঁচর' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'চঞ্চু' বা খড়কুটোর স্তূপ থেকে। আবার অনেকের মতে, মৃত্তিকাসংলগ্ন আগাছা বা শুকনো লতাপাতা পরিষ্কার করা বা 'চাঁছা' থেকেই চাঁচর শব্দের জন্ম। মূলত শুকনো ডালপালা ও খড় দিয়ে তৈরি ঘরকে চাঁচর ঘর বলা হয়।
(আরও পড়ুন: মনে করা হয়, তিনি ব্রহ্মবিদ্যার প্রতীক, সত্যের পথ দেখান! কে এই দেবী বিশালাক্ষী? কী তাঁর কাহিনি)
কেন দোলের আগের দিন এটি পালন করা হয়?
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: মনে করা হয়, তিনি ব্রহ্মবিদ্যার প্রতীক, সত্যের পথ দেখান! কে এই দেবী বিশালাক্ষী? কী তাঁর কাহিনি)
কেন দোলের আগের দিন এটি পালন করা হয়?
{{/usCountry}}পৌরাণিক এবং বৈজ্ঞানিক—উভয় দিক থেকেই এই প্রথার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে:
১. পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: ভাগবত পুরাণ অনুসারে, এই দিনেই ভক্ত প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টাকালে হিরণ্যকশিপুর বোন 'হোলিকা' আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ রক্ষা পান। এই ঘটনাটি অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তাই অশুভকে দহন করার এই প্রথা দোলের আগের রাতে পালিত হয়।
২. ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব: বসন্তকাল মানেই শীতের বিদায় এবং গরমের শুরু। এই সময় প্রকৃতিতে প্রচুর শুকনো পাতা ও ডাল জমা হয়। প্রাচীনকালে কৃষিভিত্তিক সমাজে মাঠ পরিষ্কার করার জন্য এই আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলা হতো। আবার আগুনের ধোঁয়া পরিবেশে থাকা বসন্তকালীন অনেক ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
৩. শুদ্ধিকরণ: আগুনের ধর্ম হলো পুড়িয়ে শুদ্ধ করা। মানুষের ভেতরের ইর্ষা, দ্বেষ ও কলুষতা পুড়িয়ে ফেলে পরদিন আবিরের পবিত্র রঙে একে অপরকে রাঙিয়ে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিই হলো এই ন্যাড়াপোড়া।
পালনের পদ্ধতি ও লোকবিশ্বাস
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ন্যাড়াপোড়া পালনের ভিন্ন ভিন্ন রীতি আছে। কোথাও শুকনো বাঁশের ওপর খড় দিয়ে মানুষের মতো আকৃতি তৈরি করা হয়, যাকে বলা হয় 'মেড়া'। কোথাও আবার ভেড়া বা কুঁড়েঘরের আদল তৈরি করা হয়। আগুন জ্বালানোর পর সেই আগুনের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে বলা হয়— "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল / পূর্ণিমাতে কৃষ্ণ নাচে, মুখে হরিবোল!" দগ্ধ হওয়া আগুন থেকে পোড়া খড় বা বাঁশ নিয়ে কৃষি জমিতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথাও অনেক জায়গায় প্রচলিত, যাতে ফলন ভালো হয়।
(আরও পড়ুন: হোলিকা দহনের দিনে কী ঘটেছিল? কীভাবে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান ভক্ত প্রহ্লাদ, জেনে নিন সেই গল্প)
ন্যাড়াপোড়া বা চাঁচর কেবল একটি আগুনের উৎসব নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটি আমাদের শেখায় যে, নতুনকে বরণ করতে হলে পুরনো জঞ্জালকে ত্যাগ করতে হয়। আগুনের এই লেলিহান শিখা যেমন সমস্ত অন্ধকার গ্রাস করে নেয়, তেমনই দোল উৎসবের রঙ আমাদের জীবনে সাম্য ও মৈত্রীর বার্তা বয়ে নিয়ে আসে।