ভারতবর্ষের তান্ত্রিক ঐতিহ্যের এক পরম রহস্যময়ী এবং শক্তিশালী দেবী হলেন বজ্রযোগিনী। তিনি যেমন হিন্দু তন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যা, তেমনই মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে তাঁকে 'বুদ্ধত্ব' লাভের প্রধান উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। দেবী বজ্রযোগিনী কেবল এক পৌরাণিক চরিত্র নন, তিনি মানুষের অন্তরের সুপ্ত চেতনার সেই প্রচণ্ড অগ্নিরূপ, যা মোহ ও অজ্ঞানতাকে ভস্মীভূত করে পরম জ্ঞান বা 'নির্বাণ' প্রদান করে।

দেবী বজ্রযোগিনীকে সাধারণত লাল বর্ণের এবং অত্যন্ত তেজস্বী রূপে কল্পনা করা হয়। তাঁর এক হাতে থাকে 'কর্তিকা' (যা দিয়ে তিনি মায়া ছেদন করেন) এবং অন্য হাতে 'কপাল' বা নর করোটি। তিনি মূলত 'বজ্র' অর্থাৎ অবিনশ্বর সত্য এবং 'যোগিনী' অর্থাৎ নারীশক্তির আধ্যাত্মিক মিলনের রূপ।
(আরও পড়ুন: দেবী ছিন্নমস্তাকে অনেকেই প্রচণ্ড ভয় পান! তাঁর এই রুদ্র রূপের কারণ কী? কী তাঁর কাহিনি)
কেন তিনি ‘সর্ববুদ্ধডাকিনী’?
বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী, দেবী বজ্রযোগিনী হলেন সকল বুদ্ধের সারতত্ত্ব। তাঁকে 'সর্ববুদ্ধডাকিনী' বলা হয় কারণ বিশ্বাস করা হয় যে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত বুদ্ধগণ এই দেবীর জ্ঞান ও শক্তির মাধ্যমেই পরম সত্য লাভ করেছেন। 'ডাকিনী' শব্দটির অর্থ এখানে কেবল কোনো প্রেতাত্মা নয়, বরং আকাশচারী এক উচ্চতর চেতনা যা সাধককে সাধারণ জগত থেকে পরম শূন্যতার দিকে নিয়ে যায়। তিনি সমস্ত বুদ্ধের প্রজ্ঞা ও আনন্দের আধার।
জ্ঞান ও সাধনার চরম রূপ
বজ্রযোগিনী সাধনাকে বলা হয় 'অনুত্তরযোগ তন্ত্র'। তিনি জ্ঞান ও সাধনার চরম রূপ হিসেবে গণ্য হন কারণ তাঁর সাধনা একজন মানুষকে অতি দ্রুত জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করতে পারে। তাঁর রূপের প্রতিটি অংশ এক একটি দার্শনিক অর্থ বহন করে। তাঁর গলার মুণ্ডমালা মানুষের অহংকারের বিনাশের প্রতীক এবং তাঁর পদতলে পিষ্ট অসুরগুলো হলো কাম, ক্রোধ ও মোহের বিনাশ। তিনি শেখান যে, শরীর এবং মনকে দহন করেই পরম জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।
{{/usCountry}}বজ্রযোগিনী সাধনাকে বলা হয় 'অনুত্তরযোগ তন্ত্র'। তিনি জ্ঞান ও সাধনার চরম রূপ হিসেবে গণ্য হন কারণ তাঁর সাধনা একজন মানুষকে অতি দ্রুত জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করতে পারে। তাঁর রূপের প্রতিটি অংশ এক একটি দার্শনিক অর্থ বহন করে। তাঁর গলার মুণ্ডমালা মানুষের অহংকারের বিনাশের প্রতীক এবং তাঁর পদতলে পিষ্ট অসুরগুলো হলো কাম, ক্রোধ ও মোহের বিনাশ। তিনি শেখান যে, শরীর এবং মনকে দহন করেই পরম জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: মনে করা হয়, তিনি ব্রহ্মবিদ্যার প্রতীক, সত্যের পথ দেখান! কে এই দেবী বিশালাক্ষী? কী তাঁর কাহিনি)
ভারতীর তন্ত্রশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং শক্তিবাদ কী বলছে?
- তন্ত্রশাস্ত্র: হিন্দু তন্ত্রে তাঁকে অনেক সময় 'ছিন্নমস্তা' বা 'প্রচণ্ড চণ্ডিকা'র সাথে তুলনা করা হয়। তান্ত্রিকদের মতে, তিনি কুণ্ডলিনী শক্তির সেই ঊর্ধ্বারোহণ যা মানুষের ব্রহ্মরন্ধ্রকে উন্মুক্ত করে। তাঁর সাধনা অত্যন্ত গুহ্য এবং বিপজ্জনক, যা কেবল গুরুর নির্দেশে করা সম্ভব।
- শক্তিবাদ: শক্তিবাদ অনুযায়ী, তিনি আদ্যাশক্তি। তিনি সৃষ্টির বিনাশ ঘটিয়ে পুনরায় নতুনের সূচনা করেন। তিনি মহাজাগতিক প্রাণশক্তির সেই স্পন্দন যা সারা মহাবিশ্বে পরিব্যাপ্ত।
- জ্যোতিষশাস্ত্র: জ্যোতিষ মতে, যাদের কুণ্ডলীতে রাহু বা শনির অত্যন্ত অশুভ প্রভাব রয়েছে এবং যারা মানসিক ভ্রম বা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তাঁদের জন্য বজ্রযোগিনীর মন্ত্র জপ অত্যন্ত কার্যকর। তিনি ভ্রম বা ইলিউশন দূর করে সত্যকে দেখার চোখ দান করেন।
(আরও পড়ুন: অত্যন্ত রহস্যময়ী এবং শক্তিশালী দেবী কাটেরি আম্মান, তাঁকে সকলে এত ভয় পান কেন? কী বলছে তন্ত্রশাস্ত্র)
পুজোর সময় যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখতে হয়
দেবী বজ্রযোগিনীর পুজো অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ এবং কঠোর।
১. পবিত্রতা ও সংযম: এই পুজোয় মানসিক পবিত্রতা প্রধান। সাধককে আমিষ আহার এবং নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হয়।
২. গোপন সাধনা: বজ্রযোগিনী হলেন 'গুহ্য' দেবী। তাঁর মন্ত্র বা সাধনা পদ্ধতি জনসমক্ষে আলোচনা করা নিষিদ্ধ।
৩. গুরুবাদ: উপযুক্ত গুরু ছাড়া তাঁর উপাসনা করা উচিত নয়, কারণ তাঁর তীব্র শক্তি সহ্য করার মতো মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
৪. চক্র পূজা: অনেক সময় তান্ত্রিক চক্রে তাঁর পুজো করা হয়, যেখানে পঞ্চ ম-কার বা প্রতীকী উপচারের ব্যবহার থাকে।
(আরও পড়ুন: ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিলেন দেবী ভ্রমরী! তান্ত্রিক মতে, নাদ সাধনায় হয় তাঁর পুজো, কেন তাঁর উপাসনা অত্যন্ত গুহ্য)
দেবী বজ্রযোগিনী বা সর্ববুদ্ধডাকিনী আসলে আমাদের অন্তরের সেই তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা যা দিয়ে আমরা নিজেদের ভেতরকার অন্ধকারকে চিনতে পারি। তাঁর রক্তিম বর্ণ ত্যাগের ও আনন্দের প্রতীক। যারা সাহসের সাথে জীবনের সত্যকে আলিঙ্গন করতে চান, বজ্রযোগিনী তাঁদের কাছে পরম জননী ও পথপ্রদর্শক।