পশ্চিমবঙ্গের নগরায়ণ দ্রুত গতিতে বাড়লেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ এবং যানজট। বর্তমানে রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ শহরে বাস করেন, যার একটি বিশাল অংশ কলকাতা এবং পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলেই। কিন্তু এই শহরগুলির পরিবহণ ব্যবস্থা এখনও পুরনো ধাঁচেই রয়ে গিয়েছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই পরিস্থিতিতে ২০৩১ সালের মধ্যে এক টেকসই এবং আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি নতুন রোডম্যাপ বা রূপরেখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা। সেই চার্টার বা রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে 'সাসটেনেবল মোবিলিটি নেটওয়ার্ক'-র তরফে। যে ছাতার তলায় একাধিক নাগরিক মঞ্চ আছে।
সংকটের মুখে বর্তমান পরিবহণ ব্যবস্থা

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপরিকল্পিত যানবাহন বৃদ্ধি এবং রাস্তার তুলনায় গাড়ির আধিক্য। শহরের সরকারি বাসের সংখ্যা ৬,০০০ থেকে কমে ৩,৫০০-তে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ৭২ শতাংশ যাত্রীই অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল, কলকাতার অধিকাংশ বাসই পুরনো ডিজেল চালিত, যা বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। আসানসোল এবং দুর্গাপুরের অবস্থাও তথৈবচ।
আরও পড়ুন: Mamata Banerjee: 'মমতা বারবার পৃথিবীতে আসবেন না, তাঁর গান বাঙালির ঘরে-ঘরে বাজবে', দাবি সাহিত্যিকের
২০৩১-এর লক্ষ্য: আধুনিক ও জনবান্ধব পরিকাঠামো
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেজন্য তাঁরা কয়েকটি পরিকল্পনা দিয়েছেন।
১) ডেডিকেটেড ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি ও ফান্ড: কলকাতা এবং পশ্চিম বর্ধমানের জন্য পৃথক পরিবহণ সংস্থা গঠন করতে হবে। ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম এবং পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের তহবিল ব্যবহার করে একটি 'আর্বান ট্রান্সপোর্ট ফান্ড' তৈরি করা দরকার, যা সরাসরি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হবে।
{{/usCountry}}১) ডেডিকেটেড ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি ও ফান্ড: কলকাতা এবং পশ্চিম বর্ধমানের জন্য পৃথক পরিবহণ সংস্থা গঠন করতে হবে। ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম এবং পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের তহবিল ব্যবহার করে একটি 'আর্বান ট্রান্সপোর্ট ফান্ড' তৈরি করা দরকার, যা সরাসরি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হবে।
{{/usCountry}}২) বাস পরিষেবার মানোন্নয়ন: প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য অন্তত ৬০টি আধুনিক বাস নিশ্চিত করতে হবে। এই বাসগুলিতে লো-ফ্লোর, এয়ার কন্ডিশনার, র্যাম্প এবং এমার্জেন্সি বাটনের মতো সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি নাগরিকের বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথের মধ্যে বাস স্টপেজ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রাখতে হবে।
৩) বৈদ্যুতিক যানবাহনে জোর: বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ইভি-র হার মাত্র ১.৫ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে বেশ কম। লক্ষ্য হওয়া উচিত যে ২০৩১ সালের মধ্যে সমস্ত নতুন বাস এবং অন্তত ৫০ শতাংশ অটো-রিকশাকে বৈদ্যুতিক মডেলে রূপান্তরিত করা। প্রতি ২০টি ইভির জন্য একটি চার্জিং পয়েন্ট এবং তার অন্তত অর্ধেক পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি (সৌরবিদ্যুৎ) দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
নারী সুরক্ষা ও গতিশীলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালু হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে কলকাতা ও দুর্গাপুরের প্রায় অর্ধেক মহিলা যাত্রী এই সুবিধা পেলে গণপরিবহন ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবেন। এটি কেবল তাঁদের স্বনির্ভরতাই বাড়াবে না, বরং কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি করবে। এছাড়া, পরিবহণ কর্মীদের নিয়মিত জেন্ডার সেনসিটাইজেশন বা লিঙ্গ-সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের গুরুত্ব
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শহরাঞ্চলে যাতায়াতের ৬০-৭০ শতাংশই চার কিলোমিটারের কম দূরত্বের। তাই ‘পিপল-ফার্স্ট’ জোন তৈরি করে ফুটপাত এবং সাইকেল ট্র্যাকের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে স্কুল জোনগুলোতে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং পুরনো দূষণকারী গাড়ি স্ক্র্যাপ করার জন্য সরকারি ইনসেনটিভ প্রদান করা সময়ের দাবি।