কানাডার একটি গভীর খনির অভ্যন্তরে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বের প্রাচীনতম জলের উৎস। এই জল আজ থেকে প্রায় ১২০ কোটি বছর আগের। এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারটি কেবল ভূ-তত্ত্ব নয়, বরং ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার গবেষণাতেও এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

কল্পনা করুন এমন এক সময়ের কথা, যখন পৃথিবীতে কেবল এককোষী প্রাণীর আধিপত্য ছিল, ডাইনোসরদের জন্মের তখনও বহু কোটি বছর বাকি। সেই আদিম সময়ের এক ফোঁটা জল যদি আজও তার বিশুদ্ধতা বজায় রেখে টিকে থাকে, তবে তা অবশ্যই এক পরম বিস্ময়। সম্প্রতি কানাডার ওন্টারিওতে অবস্থিত 'কিড ক্রিক' (Kidd Creek) নামক একটি তামা ও দস্তার খনির প্রায় ২.৪ কিলোমিটার গভীরে এই প্রাচীন জলের সন্ধান পেয়েছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
(আরও পড়ুন: মানুষের মনের ওপর এক সময়ে সত্যিই দখল নেবে ছত্রাক? মাকড়সার পরিণতি দেখে চিন্তায় বিজ্ঞানীরা)
আদিম পৃথিবীর সংরক্ষিত ইতিহাস
বিজ্ঞানীরা এই জল পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, এটি ভূপৃষ্ঠের সাধারণ জলের মতো নয়। এটি মাটির নিচে পাথরের খাঁজে আটকা পড়ে ছিল কোটি কোটি বছর ধরে। আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই জলের বয়স অন্তত ১২০ কোটি বছর। এর আগে ২০১৩ সালে একই খনিতে পাওয়া জলের বয়স ছিল প্রায় ১৫ কোটি বছর। অর্থাৎ, বর্তমান আবিষ্কারটি পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
জলের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
জলের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য
{{/usCountry}}এই জলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষকরা কিছু চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। এটি সাধারণ পানীয় জলের তুলনায় অনেক বেশি নোনা এবং খনিজ সমৃদ্ধ। এর ঘনত্ব অনেক বেশি এবং এতে প্রচুর পরিমাণে হিলিয়াম, নিয়ন এবং আর্গনের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জল যখন পাথরের স্তরে আটকা পড়েছিল, তখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং পরিবেশ আজকের তুলনায় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
প্রাণের স্পন্দন কি আজও বহমান?
এই আবিষ্কারের সবথেকে বড় আকর্ষণ হলো—এই প্রাচীন জলে কি কোনো প্রাণ আছে? বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন যে, এই গভীরতায় এবং এত প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও জলে কিছু অণুজীবের অস্তিত্বের সংকেত পাওয়া গেছে। সূর্যের আলো বা অক্সিজেন ছাড়াই এই অণুজীবগুলো পাথরের রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি সংগ্রহ করে টিকে আছে। এটি প্রমাণ করে যে, চরম প্রতিকূল পরিবেশেও প্রাণ তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে।
(আরও পড়ুন: সকলের নয়, চলন্ত গাড়িতে কারও কারও বমি পায়, পূর্বপুরুষদের বিষাক্ত খাবার খাওয়ার ভুলে এই সমস্যা! বলছে বিজ্ঞান)
মঙ্গল গ্রহে প্রাণের সংকেত?
এই আবিষ্কারটি কেবল পৃথিবীর ইতিহাসের জন্য নয়, বরং মহাকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মঙ্গল গ্রহের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন কানাডার এই খনির পাথরের স্তরের সাথে অনেকটা মিলসম্পন্ন। যদি পৃথিবীর এত গভীরে ১২০ কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে থাকতে পারে, তবে মঙ্গল গ্রহের মাটির নিচেও হয়তো সুপ্ত অবস্থায় প্রাণ লুকিয়ে থাকা অসম্ভব নয়। এটি নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর মঙ্গল অভিযানের পরিকল্পনাকে আরও উৎসাহিত করেছে।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
কানাডার খনিতে পাওয়া এই জল কেবল একটি তরল পদার্থ নয়, এটি আসলে সময়ের এক ক্যাপসুল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর অন্দরমহলে এমন অনেক রহস্য আজও লুকিয়ে আছে যা আমাদের চেনা জগতের সংজ্ঞাকে বদলে দিতে পারে। ১২০ কোটি বছরের এই পুরনো জল আমাদের সামনে প্রাণের টিকে থাকার এক অজেয় শক্তির গল্প বলছে।