গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা
কীভাবে মানুষকে কামড়াতে হাজির হয়েছিল মশা? উত্তর জানতে হলে পৌঁছোতে হবে ১০ হাজার বছর আগে। তখন পৃথিবীটা ছিল অন্য রকম।
মশা কেন মূলত মানুষকে কামড়ায়? এই প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের মনেই কখনও না কখনও এসেছে। মশা সবসময় মানুষের রক্তপিপাসু ছিল না। হাজার হাজার বছর আগে মশার খাদ্যাভ্যাস ছিল একেবারেই আলাদা। এক বিশেষ বিবর্তনীয় পরিবর্তনের ফলে তারা বন্য প্রাণীদের ছেড়ে মানুষের শরীরের রক্তের স্বাদ নিতে শুরু করে।

পৃথিবীতে কয়েক হাজার প্রজাতির মশা থাকলেও সব মশা মানুষকে কামড়ায় না। কিন্তু ‘এডিস ইজিপ্টি’ (Aedes aegypti) নামক প্রজাতিটি, যা ডেঙ্গু, জিকা এবং পীতজ্বরের মতো রোগ ছড়ায়, তারা মানুষের রক্তের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আসক্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল একটি টিকে থাকার লড়াই বা বিবর্তনীয় কৌশল।
(আরও পড়ুন: ডাইনোসরের আগে থেকে পৃথিবীতে আছে এই মাছগুলি! এর মধ্যে একটি তো সকলেরই চেনা)
মশার আদি ইতিহাস: যখন রক্ত ছিল না প্রধান খাদ্য
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, কয়েক হাজার বছর আগেও মশারা মূলত বনজঙ্গলে থাকত এবং তারা অন্যান্য বন্য প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকত। মজার বিষয় হলো, পুরুষ মশা কখনোই রক্ত খায় না, তারা কেবল ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে। কেবল স্ত্রী মশারাই ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহের তাগিদে রক্তের ওপর নির্ভর করে। আদিম সময়ে মানুষের বসতি খুব কম ছিল, তাই মশারা মূলত জঙ্গল ও জলাশয়ের আশেপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিবর্তনের মোড়: জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের বসতি
মশারা কখন মানুষকে কামড়ানো শুরু করল, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের মশার জেনোম বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গেছে, প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ বছর আগে যখন সাহারা মরুভূমি অঞ্চল শুষ্ক হতে শুরু করে, তখন জলের অভাব দেখা দেয়। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য মশারা জলের সন্ধানে মানুষের বসতির দিকে অগ্রসর হয়।
মানুষ যেহেতু জল ধরে রাখার জন্য পাত্র, কুয়ো বা ড্রাম ব্যবহার করত, তাই মশারা সেখানে ডিম পাড়ার আদর্শ জায়গা খুঁজে পায়। জলের সন্ধানে মানুষের কাছে আসার ফলে তারা মানুষের রক্তের স্বাদ পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক এলাকায় বসবাসকারী মশাগুলোর মধ্যে মানুষের রক্তের প্রতি আকর্ষণ আর্দ্র বা জঙ্গল এলাকায় থাকা মশার তুলনায় অনেক বেশি।
মানুষের গন্ধ ও মশার মস্তিষ্ক
কেন মশা অন্য প্রাণীর চেয়ে মানুষকে বেশি পছন্দ করে? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, মানুষের শরীরের ঘাম এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের একটি বিশেষ 'গন্ধ' মশার মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে। বিবর্তনের ধারায় মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয় এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে, তারা অনেক দূর থেকেও মানুষের উপস্থিতি টের পায়। বিশেষ করে যেখানে জলের অভাব বেশি, সেখানকার মশারা মানুষের গন্ধকে তাদের বেঁচে থাকার সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছে।
(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
নগরায়ণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে দ্রুত নগরায়ণের ফলে মশার এই খাদ্যাভ্যাস আরও প্রকট হয়েছে। শহর অঞ্চলে জমা জল এবং মানুষের ঘনবসতি মশার বংশবৃদ্ধির জন্য স্বর্গরাজ্য। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর অনেক অঞ্চল শুষ্ক হয়ে উঠবে, যা আরও বেশি প্রজাতির মশাকে মানুষের রক্তের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে।

(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
মশা ও মানুষের এই রক্তক্ষয়ী সম্পর্ক আসলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের জীবনযাত্রার একটি পরোক্ষ ফল। মশার এই বিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে কতটা অদ্ভুত পথ বেছে নিতে পারে। মশার কামড় থেকে বাঁচতে কেবল মশা তাড়ানোই যথেষ্ট নয়, আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে সচেতন হওয়াও একান্ত প্রয়োজন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


