শত শত কিলোমিটার দৈত্যাকার হাতিদের তাড়া করে শিকার করত এই আদিম মানব! তাদের বুদ্ধির দৌড় অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের
শুধু শিকার নয়, রীতিমতো বুদ্ধি প্রয়োগ করে শিকার। নিয়ানডার্থালদের এই অদ্ভুত কৌশলের কথা জানতে পেরে চমকে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নিয়ানডার্থাল (Neanderthals) মানুষদের আমরা দীর্ঘকাল ধরে কেবল স্থূল ও আদিম এক প্রজাতি হিসেবে ভেবে এসেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা আমাদের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। জানা গিয়েছে, বরফ যুগের ইউরোপে নিয়ানডার্থালরা কেবল টিকে ছিল না, বরং তারা বিশালাকায় হাতিদের (Straight-tusked elephants) শত শত কিলোমিটার পথ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত।

ইউরোপের হিমশীতল প্রান্তরে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার বছর আগে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। আজকের আফ্রিকান হাতির চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ বড় ‘স্ট্রেইট-টাস্কড’ হাতিদের একদল নিয়ানডার্থাল মানুষ সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ানডার্থালরা কেবল সুযোগ বুঝে শিকার করত না, বরং তারা ছিল অত্যন্ত দক্ষ রণকৌশলী।
দানবীয় হাতি ও নিয়ানডার্থালদের লড়াই
এই প্রাচীন হাতিগুলো উচ্চতায় প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত হতো এবং এদের ওজন ছিল ১৩ টনেরও বেশি। একা কোনো মানুষের পক্ষে এদের শিকার করা ছিল অসম্ভব। গবেষকরা জার্মানির গ্রোবেন-নিউমার্ক অঞ্চলে পাওয়া হাতির হাড়ের অবশেষ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, নিয়ানডার্থালরা দলবদ্ধভাবে এই বিশাল প্রাণীদের আক্রমণ করত। তারা হাতিদের কাদা বা জলাভূমির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যেত যেখানে বিশালাকায় প্রাণীগুলো আটকে পড়ত এবং নড়াচড়া করতে পারত না।
(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
শত কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রা
সবথেকে বিস্ময়কর তথ্য হলো, নিয়ানডার্থালরা এই হাতিদের কেবল এক জায়গায় শিকার করত না। তারা পশুদের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করত এবং শত শত কিলোমিটার জুড়ে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যেত। এটি প্রমাণ করে যে নিয়ানডার্থালদের মধ্যে উচ্চতর ভৌগোলিক জ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করার ক্ষমতা ছিল। তারা জানত কোথায় খাদ্যের অভাব হবে এবং কোথায় হাতিদের শিকার করা সহজ হবে।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
কেন এই শিকার এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
একটি বিশালাকায় হাতি শিকার করার অর্থ ছিল একটি পুরো নিয়ানডার্থাল গোষ্ঠীর জন্য কয়েক মাসের খাবারের সংস্থান হওয়া। গবেষকদের মতে, একটি হাতি থেকে পাওয়া মাংস ও চর্বি প্রায় ৩৫০ জন মানুষের এক সপ্তাহের ক্যালরির চাহিদা মেটাতে পারত। এই বিপুল পরিমাণ মাংস সংরক্ষণ করার কৌশলও সম্ভবত তাদের জানা ছিল। এছাড়া হাতির হাড় ও চামড়া ব্যবহার করে তারা শীতের পোশাক ও ঘর তৈরি করত।
(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)

সামাজিক কাঠামো ও বুদ্ধিমত্তা
এই ধরণের বড় পরিসরে শিকারের আয়োজন করতে গেলে প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। নিয়ানডার্থালরা একে অপরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করত এবং আক্রমণের সময় সমন্বয় বজায় রাখত। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার এক নতুন পরিচয় দেয়। তারা কেবল পেশিশক্তিতে নয়, বরং মগজাস্ত্রেও ছিল আধুনিক মানুষের সমকক্ষ।
নিয়ানডার্থালদের এই ‘ম্যামথ’ বা দানবীয় হাতি শিকারের গল্প আমাদের শেখায় যে প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য কেবল গায়ের জোর যথেষ্ট নয়। বরফ যুগের সেই প্রতিকূল পরিবেশে নিয়ানডার্থালদের এই রণকৌশল আজও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। তারা হারিয়ে গেলেও তাদের এই লড়াকু ইতিহাস আমাদের বিবর্তনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে টিকে থাকবে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


