Success Story: আজকের যুগে সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা (নিট) বা সর্বভারতীয় জয়েন্ট প্রবেশিকার (জেইই মেন) মতো পরীক্ষায় মনের মতো ফলাফল না হলে অনেকেই ভেঙে পড়েন। সমাজের বাঁকা নজরও সেই হতাশাকে বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু একটি পরীক্ষা কখনও কারওজীবনের শেষ কথা হতে পারে না। এই ধ্রুবসত্যকে নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন সঞ্জয় বি কে। তিনবার নিট পরীক্ষায় ব্যর্থতা, জেইই মেইন বা অ্যাডভান্সে তথাকথিত ভালো র্যাঙ্ক না করেও আজ তিনি পুণের একটি নামী সংস্থায় সফল ‘ডেটা সায়েন্টিস্ট’ হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি লিঙ্কডউনে নিজের এই অদম্য জীবনযুদ্ধের কাহিনী শেয়ার করেছেন সঞ্জয় বি, যা রাতারাতি নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।
হতাশা ও একাকীত্বের সেই অন্ধকার দিনগুলি

সঞ্জয়ের কেরিয়ারের এই পথ মসৃণ ছিল না। দ্বাদশ শ্রেণির পর থেকে তাঁর জীবন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত—প্রায় দীর্ঘ ২০ মাস তিনি নিজেকে সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মোবাইল ফোন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি সরকারি মেডিকেল সিট পাওয়া। সঞ্জয় তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘উৎসবের দিনগুলো কেটে যেত। ঋতু পরিবর্তন হত। কিন্তু আমার রুটিনে কোনও বদল আসত না। আমি ক্লান্ত, একাকী এবং ভীষণ ভীত অবস্থায় দিনরাত শুধু পড়াশোনা করে যেতাম।’
২০ ২১ সাল এবং ২০২২ সালের দু'বার নিট দিয়েছিলেন। কিন্তু কাঙ্খিত ফল মেলেনি। সঞ্জয় জানিয়েছেন যে বাবা-মায়ের মনে অনেক আশা থাকায় নিজের মনের কষ্ট বা হতাশার কথা তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। এই সময়ে তাঁর সহপাঠী ও বন্ধুরা যখন বিভিন্ন নামী কলেজে ভর্তি হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নিজেকে ভীষণ একা এবং পরিবারের ওপর একটি 'বোঝা' বলে মনে হত তাঁর। কিন্তু এই চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সঞ্জয় সম্পূর্ণভাবে হার মানেননি।
জীবিকার তাগিদে লড়াই এবং কাজের ফাঁকে পড়াশোনা
পরবর্তী নিট পরীক্ষার আগে যখন হাতে মাত্র ছয় থেকে সাত মাস সময় বাকি, তখন সঞ্জয় সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি চাকরি খুঁজবেন। তবে এই পথটিও সহজ ছিল না। একের পর এক রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পাঁচটি ভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দেওয়ার পর তিনি সেলসকর্মীর চাকরি পান।
{{/usCountry}}পরবর্তী নিট পরীক্ষার আগে যখন হাতে মাত্র ছয় থেকে সাত মাস সময় বাকি, তখন সঞ্জয় সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি চাকরি খুঁজবেন। তবে এই পথটিও সহজ ছিল না। একের পর এক রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পাঁচটি ভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দেওয়ার পর তিনি সেলসকর্মীর চাকরি পান।
{{/usCountry}}চাকরি পাওয়ার পর সঞ্জয়ের লড়াই আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়। কাজ এবং পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় ব্যাগে করে বই নিয়ে যেতেন। কাজের ফাঁকে ছোটখাটো ব্রেক বা লাঞ্চের সময়েও তিনি পড়াশোনা করতেন। পরীক্ষার ঠিক আগে তিনি আনপেড লিভ নেন এবং নিজের পড়াশোনার কৌশল সম্পূর্ণ পরিবর্তন করেন। এই কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তাঁর তৃতীয়বার নিটে তিনি ৪৫০-এর বেশি নম্বর অর্জন করতে সক্ষম হন।
আইআইটি মাদ্রাজ এবং কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট
তৃতীয় অ্যাটেম্পটে নিট স্কোরের উন্নতি হলেও, পরিবারের আর্থিক অনটন এবং বয়সের কারণে সঞ্জয়ের পক্ষে আর মেডিকেল পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল না। এই সময়েই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টটি আসে। তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) মাদ্রাজের 'বিএস ইন ডেটা সায়েন্স' প্রোগ্রামের বিষয়ে জানতে পারেন।
এই কোর্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল যে তাতে ভরতির জন্য জেইই অ্যাডভান্সড পরীক্ষায় কোনও র্যাঙ্কের প্রয়োজন হয় না, বরং আইআইটি মাদ্রাজের নিজস্ব একটি কোয়ালিফায়ার পরীক্ষা পাশ করতে হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে সেই কোয়ালিফায়ার পরীক্ষায় পাশ করেন সঞ্জয়। সেই কোর্সের পরে পুণেতে ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কেরিয়ার গড়েছেন।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে সঞ্জয়ের মূল্যবান বার্তা
প্রার্থীদের পরামর্শ দিয়ে সঞ্জয় বলেছেন, ‘কখনও একটি মাত্র প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলাভলের ওপর ভিত্তি করে নিজের যোগ্যতা বিচার কর না। কোনও পরীক্ষাই তোমার জীবনের আসল মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। যদি কোনও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাও, তাহলে কারও সঙ্গে কথা বল। মনে রাখবে, তোমার গল্প এখনও শেষ হয়ে যায়নি।’