পৃথিবীর গভীরে লুকানো রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমরা এতদিন জানতাম পৃথিবীর জলভাগ বলতে কেবল মহাসাগর, নদ-নদী আর ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে বোঝায়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের পায়ের কয়েকশো কিলোমিটার নিচে লুকিয়ে আছে এক বিশাল 'জলভাণ্ডার', যা পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের মিলিত জলের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিনের গবেষণার পর নিশ্চিত করেছেন যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠতল থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৬৬০ কিলোমিটার নিচে, অর্থাৎ 'ট্রানজিশন জোন' (Transition Zone)-এ একটি বিশাল জলের ভাণ্ডার রয়েছে। এই আবিষ্কারটি কেবল চমকপ্রদই নয়, এটি পৃথিবীর জলচক্র এবং গ্রহের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
(আরও পড়ুন: আলোর গতি তো জানেন, অন্ধকারের গতি কত জানেন কি? নতুন আবিষ্কার চমকে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের! বদলে যেতে পারে অনেক হিসাব)
রিংউডাইট: জলের ধারক নীল খনিজ
এই জলভাণ্ডারটি কিন্তু আমাদের পরিচিত তরল সমুদ্রের মতো নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই জল 'রিংউডাইট' (Ringwoodite) নামক একটি বিশেষ নীল খনিজের মধ্যে আটকে আছে। উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রার কারণে এই খনিজটি স্পঞ্জের মতো জল শুষে রাখতে পারে। ভূতত্ত্ববিদ স্টিভ জ্যাকবসেনের মতে, এই খনিজটি পৃথিবীর ম্যান্টলের গভীরে এক বিশাল আর্দ্র অঞ্চল তৈরি করেছে।
(আরও পড়ুন: আমরা নাকি মোটে ‘৮০ শতাংশ’ মানুষ! বাকি ২০ শতাংশ জুড়ে কারা? DNA-এর ভিতর থেকে ভূতুড়ে সংকেত পেলেন বিজ্ঞানীরা)
কীভাবে মিলল এই রহস্যের সন্ধান?
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: আমরা নাকি মোটে ‘৮০ শতাংশ’ মানুষ! বাকি ২০ শতাংশ জুড়ে কারা? DNA-এর ভিতর থেকে ভূতুড়ে সংকেত পেলেন বিজ্ঞানীরা)
কীভাবে মিলল এই রহস্যের সন্ধান?
{{/usCountry}}গবেষকরা উত্তর আমেরিকা জুড়ে স্থাপিত কয়েক হাজার সিসমোমিটার (Seismometer) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। ভূমিকম্পের তরঙ্গ যখন পৃথিবীর কেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে, নির্দিষ্ট একটি গভীরতায় শিলাগুলো ভিজে বা স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় রয়েছে। তরঙ্গের এই মন্থর গতিই নিশ্চিত করেছে যে সেখানে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রক্সিল আয়ন (জলের উপাদান) বিদ্যমান।
(আরও পড়ুন: আগে নীল বলে কোনও রংই ছিল না, সমুদ্রের জলও ছিল ‘ওয়াইনের মতো লাল’! কোথা থেকে এল এই নীল? জানলে চমকে যাবেন)
পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর উৎস কী?
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল যে, পৃথিবীতে জল কি ধূমকেতুর আছড়ে পড়ার মাধ্যমে এসেছিল, নাকি এটি পৃথিবীর জন্মের সময় থেকেই ভেতরে ছিল? এই নতুন আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মহাসাগরের জল হয়তো পৃথিবীর ভেতর থেকেই চুঁইয়ে উপরে উঠে এসেছে। যদি এই গভীর জলভাণ্ডারটি না থাকত, তবে পৃথিবীর ওপরের জলস্তর হয়তো অনেক বেশি হতো এবং আজ আমরা ডাঙ্গায় বসবাসের পরিবর্তে কেবল জলমগ্ন এক গ্রহে বাস করতাম।
(আরও পড়ুন: কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন মানুষই একমাত্র প্রাণী, যারা রান্না করতে পারে! অন্য কেউ পারল না কেন?)
ভূ-তাত্ত্বিক প্রভাব
পৃথিবীর গভীরে এই জলের উপস্থিতি আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জল শিলাগুলোকে কিছুটা পিচ্ছিল বা নমনীয় রাখে, যার ফলে প্লেটগুলোর নড়াচড়া সহজ হয়। এই আবিষ্কারটি আগামীর ভূমিকম্প গবেষণা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
(আরও পড়ুন: পুরুষের পেটে ‘সন্তান’! নাগপুরের সঞ্জু ভগতের ঘটনা এখনও এক বিস্ময়, Fetus-in-Fetu-র বিরল উদাহরণ)
প্রকৃতি তার রহস্যের ঝুলি নিয়ে আমাদের সবসময়ই অবাক করে। যেখানে মানুষের পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব, সেই গভীর ম্যান্টলে লুকিয়ে থাকা এই 'লুকানো মহাসাগর' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও কতটা সীমিত। এই আবিষ্কার কেবল ভূ-বিজ্ঞানের সাফল্য নয়, এটি আমাদের নীল গ্রহের টিকে থাকার এক অদৃশ্য চালিকাশক্তি হিসেবেও প্রমাণিত হতে পারে।