এক এক মানুষকে এক এক রকম দেখতে, কিন্তু বাকি প্রাণীদের নিজেদের দলে সকলের মুখ প্রায় এক রকম কেন? রহস্যের সন্ধান পেল বিজ্ঞান

এক এক জন মানুষকে এক এক রকম দেখতে হলেও অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। তাদের মুখের ধরন প্রায় এক রকম। এর কারণ কী? এত দিনে বিবর্তনের রহস্যের সমাধান করতে পারলেন বিজ্ঞানীরা। 

Published on: Mar 28, 2026, 19:00:02 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

একই প্রজাতির প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও মানুষের একেকজনের মুখচ্ছবি একেক রকম। শিম্পাঞ্জি বা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে চেহারার এতটা পার্থক্য দেখা যায় না, যা মানুষের ক্ষেত্রে প্রকট। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের এই মুখাবয়বের বৈচিত্র্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের বিবর্তনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

মানুষের মুখ পরস্পরের থেকে আলাদা হলেও অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে তেমন নয় কেন?
মানুষের মুখ পরস্পরের থেকে আলাদা হলেও অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে তেমন নয় কেন?

আমরা যখন ভিড়ের মধ্যে হাঁটি, তখন খুব সহজেই পরিচিত মুখগুলো চিনে নিতে পারি। চোখের মণির রঙ, নাকের গড়ন বা ঠোঁটের আকৃতি—প্রতিটি মানুষের মুখমণ্ডলে রয়েছে এক অদ্বিতীয় ছাপ। কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন অন্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের মধ্যেই এই বৈচিত্র্য সবথেকে বেশি? সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আদিম সমাজে নিজেদের আলাদাভাবে চিনিয়ে রাখাটাই ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।

(আরও পড়ুন: এত যুদ্ধ-রাজনীতি, এত আবিষ্কার! তবু মানুষের ইতিহাস এখনও ‘বাচ্চা’, ডাইনোসরদের পৃথিবী শাসন করার সময়ের তুলনায়, বলছে গবেষণা)

বিবর্তনের চালিকাশক্তি: ব্যক্তিগত পরিচয়

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকদের মতে, মানুষের মুখমণ্ডলের জিনের গঠন এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে প্রতিটি মানুষ আলাদা দেখায়। বিবর্তনীয় পরিভাষায় একে বলা হয় 'ফ্রিকোয়েন্সি-ডিপেন্ডেন্ট সিলেকশন' (Frequency-dependent selection)। আদিম শিকারি-সংগ্রহকারী সমাজে যদি সবাই দেখতে একই রকম হতো, তবে কে বন্ধু আর কে শত্রু, কে পরিবারের সদস্য আর কে অপরিচিত—তা বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই সমাজে নিজের অবস্থান সুসংগত করতে এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে 'ইউনিক' বা অনন্য হওয়া ছিল অতি আবশ্যক।

(আরও পড়ুন: শত শত কিলোমিটার দৈত্যাকার হাতিদের তাড়া করে শিকার করত এই আদিম মানব! তাদের বুদ্ধির দৌড় অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের)

কেন অন্য প্রাণীদের মধ্যে এই পার্থক্য কম?

অন্যান্য প্রাইমেট বা বনমানুষদের ক্ষেত্রে সামাজিক কাঠামো মানুষের মতো অতটা জটিল নয়। তাদের চেনার জন্য ঘ্রাণশক্তি বা গলার স্বরই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি বা 'ভিজ্যুয়াল রিকগনিশন' প্রধান হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মুখমণ্ডলের সাথে সম্পর্কিত জিনগুলো শরীরের অন্য অংশের (যেমন হাত বা পায়ের লম্বা হওয়া) তুলনায় অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতি সক্রিয়ভাবে মানুষের চেহারায় বৈচিত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

(আরও পড়ুন: সল্ট লেকের গভীরে মিলল বিশাল পানীয় জলের আধার, নোনা জলের নিচে মিষ্টির হদিশ! প্রকৃতির খেলায় হতবাক বিজ্ঞানীরা)

মুখমণ্ডলের জ্যামিতি ও জেনেটিক্স

বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার মানুষের মুখমণ্ডলের মাপ নিয়ে দেখেছেন যে, আমাদের চোখের দূরত্ব, কপাল বা নাকের উচ্চতার মধ্যে যে পরিমাণ তারতম্য থাকে, তা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে দেখা যায় না। ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, এই বৈচিত্র্য নিয়ন্ত্রিত হয় বিশেষ কিছু জিন দ্বারা, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে। এটি কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং মানুষের সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশের একটি বড় প্রমাণ।

(আরও পড়ুন: দেখে তো কুমির বলেই মনে হয়, কিন্তু পাগুলো কুকুরের মতো! ভয়ঙ্কর শিকারির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা)

মুখমণ্ডলের জ্যামিতি ও জেনেটিক্স
মুখমণ্ডলের জ্যামিতি ও জেনেটিক্স

সামাজিক বিবর্তন ও টিকে থাকা

মানুষ যখন বড় বড় গোষ্ঠীতে বাস করা শুরু করল, তখন ব্যক্তিগত পরিচয় (Individual Identity) রক্ষার গুরুত্ব বেড়ে গেল। কে বিশ্বস্ত আর কে প্রতারক—তা মনে রাখার জন্য চেহারা চেনা ছিল জরুরি। বিবর্তন সেইসব মানুষদেরই বেশি সুবিধা দিয়েছে, যাদের চেহারা অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। ফলে সময়ের সাথে সাথে মানুষের চেহারায় এই বিপুল বৈচিত্র্য স্থায়ী রূপ পেয়েছে।

(আরও পড়ুন: মহাকাশে সঙ্গম করলে কী হয়? ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরে মানুষের বসতি তৈরি করে বংশবিস্তার সম্ভব? অদ্ভুত ঘটনা দেখলেন বিজ্ঞানীরা)

আমাদের প্রত্যেকের চেহারার এই ভিন্নতা আসলে প্রকৃতির এক মহৎ দান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কেবল একটি প্রজাতির অংশ নই, বরং প্রত্যেকেই একেকটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। বিবর্তনের সেই আদিম লড়াই আজ আমাদের এই সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় পৃথিবী উপহার দিয়েছে, যেখানে প্রতিটি মুখই একটি নতুন গল্প বলে।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More