রামায়ণের রহস্যময় রাক্ষস কবন্ধ! মাথা ও ঘাড়হীন এক দানব, রাম-লক্ষ্মণের হাতে মৃত্যুতেই লুকিয়ে ছিল তাঁর মুক্তি
রাক্ষস কবন্ধের কাহিনি একই সঙ্গে ভয়ের এবং করুণার। কেন তিনি এমন রূপ পেয়েছিলেন? জেনে নিন সেই অভিশাপের কথা।
রামায়ণের বিশাল ক্যানভাসে আমরা রাবণ, কুম্ভকর্ণ বা মেঘনাদের মতো প্রতাপশালী রাক্ষসদের কথা জানলেও, এমন কিছু চরিত্র রয়েছে যারা ক্ষণিকের জন্য এলেও গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এমনই এক অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর চেহারার চরিত্র হলো রাক্ষস কবন্ধ। দণ্ডকারণ্যে রাম ও লক্ষ্মণের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল এক শাপমুক্তির অলৌকিক উপাখ্যান।

সীতা হরণের পর শোকাতুর রাম ও লক্ষ্মণ যখন বনের গভীরে জানকীকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তখন দণ্ডকারণ্যের নির্জন ক্রৌঞ্চারণ্যে তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ায় এক বীভৎস প্রাণী। তাঁর নাম কবন্ধ। বাল্মীকি রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাক্ষসের কোনো মাথা বা ঘাড় ছিল না। তাঁর বিশাল পেটেই ছিল মুখ, আর বুকের মাঝখানে ছিল একটি মাত্র জ্বলজ্বলে চোখ। তাঁর দুই হাত ছিল যোজনব্যাপী লম্বা, যা দিয়ে সে বনের যেকোনো প্রাণীকে ধরে অনায়াসেই উদরস্থ করতে পারত।
(আরও পড়ুন: ভগবান বিষ্ণু থুতু থেকেই তৈরি হয় এই বৃক্ষ! এর প্রতিটি অংশে দেব-দেবীর বাস, জানেন কি পুরাণের এই কাহিনি)
কবন্ধের পূর্বজন্মের কাহিনি
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কবন্ধ জন্মসূত্রে রাক্ষস ছিলেন না। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বিশ্বাবসু। তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত সুদর্শন এবং শক্তিশালী গন্ধর্ব। কথিত আছে, বিশ্বাবসু তাঁর রূপের দম্ভে ঋষিদের অবজ্ঞা করতেন। একদিন তিনি স্থূলশিরা নামক এক ঋষিকে বিদ্রূপ করার অপরাধে অভিশপ্ত হন এবং কুৎসিত রাক্ষস রূপ ধারণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি ব্রহ্মা ও ইন্দ্রের কাছ থেকে বর এবং দণ্ড লাভ করেন। ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে তাঁর মাথা ও পা শরীরের ভেতরে ঢুকে যায়, ফলে তিনি কবন্ধ (যার অর্থ মস্তকহীন দেহ) রূপ লাভ করেন। তবে ইন্দ্র দয়াপরবশ হয়ে বলেছিলেন যে, যখন স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র তাঁর দুই হাত কেটে তাঁকে দাহ করবেন, তখনই তিনি পুনরায় তাঁর দিব্য গন্ধর্ব রূপ ফিরে পাবেন।
(আরও পড়ুন: শোকে মূহ্যমান সীতাকে ভরসা দিয়েছিলেন বিভীষণ কন্যা ত্রিজটা! রামায়ণের এই সাহসী নারীকে চেনেন কি)
রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে যুদ্ধ ও শাপমুক্তি
রাম ও লক্ষ্মণ যখন কবন্ধের সেই দীর্ঘ বাহুর কবলে পড়েন, তখন লক্ষ্মণ কিছুটা বিচলিত হলেও রাম শান্ত ছিলেন। কবন্ধ যখন তাঁদের গিলে ফেলার চেষ্টা করেন, তখন দুই ভাই একসঙ্গে কবন্ধের দুই বিশাল হাত তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলেন। যন্ত্রণার মধ্যেও কবন্ধ বুঝতে পারেন যে তাঁর মুক্তির সময় সমাগত। তিনি রামের পরিচয় জানতে চান এবং যখন নিশ্চিত হন যে ইনিই দশরথ নন্দন রাম, তখন তিনি সানন্দে নিজের মৃত্যু বরণ করতে রাজি হন।
(আরও পড়ুন: রামচন্দ্রদের চার ভাইয়ের কথা তো জানেন, কিন্তু জানেন কি তাঁদের এক বোনও ছিলেন! কে সেই শান্তা? কী তাঁর কাহিনি)
কবন্ধের পরামর্শ ও সীতাহরণের সূত্র
মুমূর্ষু কবন্ধ রামকে অনুরোধ করেন তাঁর মৃতদেহ যেন শাস্ত্রীয় মতে দাহ করা হয়। দাহ সম্পন্ন হতেই অগ্নিকুণ্ড থেকে দিব্য গন্ধর্ব বেশে বিশ্বাবসু প্রকট হন। যাওয়ার আগে তিনি রামকে এক অমূল্য পরামর্শ দেন। তিনি জানান যে, ঋষ্যমূক পর্বতে নির্বাসিত বানররাজ সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করলে রাম সীত উদ্ধার করতে সমর্থ হবেন। এমনকি তিনি পম্পা সরোবর এবং শবরীর আশ্রমের পথও রামকে নির্দেশ করে দেন।
(আরও পড়ুন: রামায়ণের ভুলে যাওয়া চরিত্র ধন্যমালিনী, রাক্ষসরাজের দ্বিতীয় স্ত্রীর বিরাট ভূমিকার কথা অনেকেই জানেন না)
আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক গুরুত্ব
কবন্ধের চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে অহংকার কীভাবে মানুষকে কদর্য করে তোলে, আবার সঠিক পথে বিনয় ও ত্যাগের মাধ্যমে সেই শাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কবন্ধ যদি রামের পথ না দেখাতেন, তবে সুগ্রীব বা হনুমানের সঙ্গে রামের সাক্ষাৎ হয়তো আরও বিলম্বিত হতো।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


