একবার নাকি মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন ঠাকুর হরিচাঁদ! ঘটনাটি কী ঘটেছিল
ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতিটি পদক্ষেপে ভক্তরা অনুভব করতেন ঈশ্বরের উপস্থিতি। ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত’ গ্রন্থে বর্ণিত একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে এক মৃতপ্রায় বা মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে ঠাকুরের করুণা বর্ষিত হয়েছিল।
মতুয়া সম্প্রদায়ের পরম আরাধ্য ও নমস্য পূর্ণব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ছিলেন প্রেম ও মানবতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর জীবন ছিল অসংখ্য অলৌকিক লীলায় ভরপুর। কবি রসরাজ তারকচন্দ্র সরকার বিরচিত ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত’ গ্রন্থে ঠাকুরের এমনই এক হাড়হিম করা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যেখানে তিনি মৃত ব্যক্তিকে জীবনদান করেছিলেন।

কেবল প্রাণ ফেরানোই নয়, সেই ঘটনার পরবর্তী প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, যা সাধারণ মানুষকে ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ চিনতে সাহায্য করেছিল। আজ সেই অলৌকিক উপাখ্যান ও তার পরবর্তী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জেনে নিন।
(আরও পড়ুন: জটায়ুর কথা তো সবাই জানেন, কিন্তু তাঁর দাদা সম্পাতির কাহিনিও দুর্দান্ত! সেই কথা অনেকেই জানেন না)
ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতিটি পদক্ষেপে ভক্তরা অনুভব করতেন ঈশ্বরের উপস্থিতি। ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত’ গ্রন্থে বর্ণিত একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে এক মৃতপ্রায় বা মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে ঠাকুরের করুণা বর্ষিত হয়েছিল।
মৃতদেহে প্রাণসঞ্চারের সেই অভাবনীয় ঘটনা
কথিত আছে, একবার এক ভক্তের পরিবারের একমাত্র সন্তান অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শোকাতুর পিতামাতা তাঁদের সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। উপস্থিত জনতা যখন শোকস্তব্ধ এবং দাহকার্যের প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দয়াল হরিচাঁদ ঠাকুর স্মিত হাস্যে এগিয়ে আসেন। তিনি মৃত দেহের ওপর হাত রেখে উচ্চৈঃস্বরে ‘হরিবোল’ ধ্বনি দেন।
হরিনামের সেই ব্রহ্মধ্বনি যেন এক মহাজাগতিক স্পন্দনের সৃষ্টি করে। দেখা যায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত ব্যক্তির শরীরে স্পন্দন ফিরে আসে এবং সে চোখ মেলে তাকায়। উপস্থিত শত শত মানুষ এই দৃশ্য দেখে ‘হরি হরিবোল’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন।
(আরও পড়ুন: গুরুদেব সোজা পথে চললেই জীবন বদলাবে ৩ রাশির! ১১ মার্চে মার্গী হবেন সেই বৃহস্পতি, সুফল পাবেন কারা)
প্রাণ ফেরার পর কী হয়েছিল?
মৃত ব্যক্তি জীবন ফিরে পাওয়ার ঠিক পরেই যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা ছিল আরও বিস্ময়কর:
১. চৈতন্য লাভ ও ভাবোন্মাদ: জীবন ফিরে পাওয়ার পর সেই ব্যক্তি যেন এক দিব্য চেতনার অধিকারী হয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের মতো কথা না বলে সরাসরি ঠাকুরের চরণে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর কণ্ঠে কেবল ‘হরি’ নাম ধ্বনিত হতে থাকে।
২. মতুয়া দর্শনের জয়গান: এই অলৌকিক ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে যে, ঠাকুর কেবল রক্ত-মাংসের মানুষ নন, তিনি স্বয়ং পূর্ণব্রহ্ম।
৩. অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রভাব: তৎকালীন সমাজে যাঁরা পিছিয়ে পড়া বা তথাকথিত ‘নিচু’ বর্ণের মানুষ ছিলেন, তাঁরা এই ঘটনার পর নিজেদের আত্মবিশ্বাস খুঁজে পান। তাঁরা বুঝতে পারেন, প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করা সম্ভব এবং ঠাকুর তাঁদের রক্ষার জন্য ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন।
(আরও পড়ুন: জন্মের আগেই নাকি পিতাকে দেখা দিয়েছিলেন ঠাকুর! শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ঘটনাটা জানেন কি)
‘হরিলীলামৃত’ গ্রন্থে এই ঘটনার পরবর্তী তাৎপর্য
তারকচন্দ্র সরকার লিখেছেন যে, এই ঘটনার পর ঠাকুর তাঁর ভক্তদের উদ্দেশ্যে এক বিশেষ বাণী প্রদান করেন। তিনি বলেন যে, শরীর নশ্বর, কিন্তু ভক্তি অবিনশ্বর। প্রাণ দান করার মাধ্যমে তিনি আসলে এটিই প্রমাণ করেছিলেন যে, যদি কেউ কায়মনোবাক্যে তাঁর শরণাপন্ন হয়, তবে তিনি যমের হাত থেকেও তাঁকে রক্ষা করতে পারেন।
এর পর থেকেই ওড়াকান্দিতে মতুয়া মেলা ও সম্মিলিত হরিনাম সংকীর্তনের ধারা আরও জোরালো হয়। ভক্তরা বুঝতে পারেন যে, ঠাকুরের দেখানো ‘হাতে কাম মুখে নাম’—এই আদর্শই প্রকৃত মুক্তির পথ। এই ঘটনার পর বহু নাস্তিক ব্যক্তিও ঠাকুরের চরণে মাথা নত করে বৈষ্ণব ধর্ম ও মতুয়া আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন।
(আরও পড়ুন: সুগ্রীবের স্ত্রী ছিলেন রুমা, তাঁর কারণেই দুই ভাইয়ের যুদ্ধ হয়! রামায়ণের এই নারীর গল্প অনেকেই জানেন না)
শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের এই লীলা কেবল অলৌকিকত্ব প্রদর্শনের জন্য ছিল না, এটি ছিল আর্তের সেবায় ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশ। মৃত ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে তোলার পর থেকে ঠাকুরের নাম ‘পতিতপাবন’ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আজ কোটি কোটি মতুয়া ভক্তের হৃদয়ে সেই হরিবোল ধ্বনি আজও অমর হয়ে আছে, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











