বর্তমানে আমরা কুমির বলতে এমন এক প্রাণীকে বুঝি, যারা জলের ধারে অলসভাবে পড়ে থাকে এবং মাঝে মাঝে জলের ভেতর ক্ষিপ্র গতিতে শিকার ধরে। কিন্তু কোটি কোটি বছর আগে কুমিরের এক বিশেষ প্রজাতি ছিল, যারা কেবল জলেই নয়, ডাঙাতেও দাপিয়ে বেড়াত। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাচীনকালে এমন এক প্রজাতির কুমির পৃথিবীতে বিচরণ করত, যারা গতির দিক থেকে একটি শিকারি কুকুরকেও অনায়াসে হারিয়ে দিতে পারত।

বিবর্তন বিজ্ঞানের ইতিহাসে কুমিরকে সবসময়ই এক শক্তিশালী শিকারি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। বিজ্ঞানীরা এমন এক প্রাচীন কুমিরের প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন, যাদের পা আজকের কুমিরের মতো পাশের দিকে ছড়ানো ছিল না, বরং সরাসরি শরীরের নিচে লম্বালম্বিভাবে ছিল—ঠিক যেমনটা দেখা যায় ঘোড়া বা কুকুরের ক্ষেত্রে। এই শারীরিক গঠনের কারণেই তারা ডাঙায় প্রচণ্ড গতিতে দৌড়াতে সক্ষম ছিল।
(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
গতির নেপথ্যে অনন্য শারীরিক গঠন
গবেষকদের মতে, এই বিশেষ প্রজাতিটির নাম ছিল 'নটোসুচিয়ান' (Notosuchians)। সাধারণত আমরা জানি কুমির সরীসৃপ হওয়ায় তাদের বুক মাটির সাথে ঘষটে চলে। কিন্তু এই নটোসুচিয়ানদের পা ছিল লম্বা এবং সোজা। ডাইনোসর যুগের এই কুমিরগুলো কেবল ডাঙায় বাস করত এবং তাদের শিকার করার পদ্ধতি ছিল অনেকটা আজকের নেকড়ে বা চিতার মতো। তারা শিকারের পেছনে দীর্ঘক্ষণ দৌড়াতে পারত এবং তাদের ক্ষিপ্রতা ছিল অবিশ্বাস্য।
(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
ডাইনোসরদের সাথে পাল্লা দেওয়া শিকারি
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
ডাইনোসরদের সাথে পাল্লা দেওয়া শিকারি
{{/usCountry}}জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস যুগে যখন বিশালকায় ডাইনোসররা পৃথিবী শাসন করছে, তখন এই ছোট ও মাঝারি আকারের দ্রুতগামী কুমিরগুলো ছিল ত্রাস। তাদের দাঁত এবং চোয়ালের গঠন ছিল আজকের কুমিরের চেয়ে আলাদা। এদের অনেকের দাঁত ছিল অনেকটা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো, যা দিয়ে তারা মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার পাশাপাশি চিবিয়ে খেতেও পারত। কোনো কোনো প্রজাতি আবার কেবল নিরামিষাশীও ছিল বলে ধারণা করা হয়।
(আরও পড়ুন: মানুষের মনের ওপর এক সময়ে সত্যিই দখল নেবে ছত্রাক? মাকড়সার পরিণতি দেখে চিন্তায় বিজ্ঞানীরা)
কেন তারা হারিয়ে গেল?
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং ডাঙায় অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিকারি প্রাণীদের উত্থানের ফলে এই দ্রুতগামী কুমিরগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিবর্তনের ধারায় কেবল সেই কুমিরগুলোই টিকে গেল, যারা জলে নিজেদের অভিযোজিত করতে পেরেছিল। ডাঙার সেই দ্রুতগামী দৌড়বিদরা ধীরে ধীরে জলজ 'অ্যামবুশ হান্টার' বা ওত পেতে থাকা শিকারিতে রূপান্তরিত হলো।
এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব
এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে কুমিরের বিবর্তন মোটেও সরল রৈখিক ছিল না। প্রকৃতি বিভিন্ন সময়ে কুমিরকে বিভিন্ন রূপে সাজিয়েছে। কখনও তারা ছিল নিরামিষাশী, কখনও ডাঙার দ্রুতগামী চিতা, আবার কখনও জলের দানব। এই নটোসুচিয়ানদের হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন প্রাচীন পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান এবং প্রাণীদের টিকে থাকার লড়াই সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছেন।
(আরও পড়ুন: গোবি মরুভূমিতে মিলল ডাইনোসর যুগের ১ সেন্টিমিটার জীবাশ্ম! বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এটি)
আজকের শান্ত ও ধীরগতির কুমিরদের দেখে কল্পনা করা কঠিন যে তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় কুকুরের মতো দ্রুতবেগে বন-জঙ্গল দাপিয়ে বেড়াত। এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবর্তনের ইতিহাসে প্রতিটি প্রাণীর এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় যাত্রা থাকে। কুমির কেবল ডাইনোসর যুগের সাক্ষীই নয়, তারা সময়ের সাথে নিজেদের বারবার বদলে নেওয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ।