মানুষের আদিমতম আবিষ্কারগুলোর মধ্যে 'আগুন' অন্যতম। আগুনের ব্যবহার কেবল আমাদের রান্না করা খাবার বা নিরাপত্তা দেয়নি, বরং এটি আমাদের শরীরের গভীরে থাকা ডিএনএ (DNA)-তেও চিরস্থায়ী পরিবর্তন এনেছে। পপুলার সায়েন্স (Popular Science)-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে জীববিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রথম আগুনের নিয়ন্ত্রণ শিখল, তখন থেকেই মানব প্রজাতির ইতিহাস বদলে যেতে শুরু করে। আগুন আমাদের শীত থেকে বাঁচিয়েছে, অন্ধকার দূর করেছে এবং হিংস্র পশুর হাত থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আগুনের ধোঁয়ায় থাকা বিষাক্ত পদার্থের সাথে লড়াই করতে গিয়ে আমাদের ডিএনএ-তে এক বিশেষ ধরণের অভিযোজন বা 'মিউটেশন' ঘটেছে, যা অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না।
আগুনের ধোঁয়া ও বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই
আগুনের ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন থাকে, যা ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে এবং ডিএনএ-তে পরিবর্তন এনে ক্যান্সার ঘটাতে পারে। আদিম মানুষ যখন গুহার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে থাকতে শুরু করল, তখন তারা প্রতিনিয়ত এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসত। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, এই ধোঁয়ার বিষক্রিয়া সহ্য করার জন্য মানুষের শরীরে একটি বিশেষ জিনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনটি আমাদের শরীরকে ধোঁয়ার বিষাক্ত পদার্থগুলো আরও দ্রুত ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে।
কেন অন্য প্রাণীদের মধ্যে এই পরিবর্তন নেই?
গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়ানডার্থাল (Neanderthals) বা ডেনিসোভানদের (Denisovans) মতো আদিম প্রজাতির মানুষের মধ্যে এই বিশেষ ডিএনএ মিউটেশন ছিল না। ফলে তারা আগুনের ধোঁয়ায় অনেক বেশি সংবেদনশীল ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই জেনেটিক সুবিধার কারণেই আধুনিক মানুষ বা 'হোমো সেপিয়েন্স' দীর্ঘ সময় আগুনের পাশে থেকেও সুস্থ থাকতে পেরেছে এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।
{{/usCountry}}গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়ানডার্থাল (Neanderthals) বা ডেনিসোভানদের (Denisovans) মতো আদিম প্রজাতির মানুষের মধ্যে এই বিশেষ ডিএনএ মিউটেশন ছিল না। ফলে তারা আগুনের ধোঁয়ায় অনেক বেশি সংবেদনশীল ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই জেনেটিক সুবিধার কারণেই আধুনিক মানুষ বা 'হোমো সেপিয়েন্স' দীর্ঘ সময় আগুনের পাশে থেকেও সুস্থ থাকতে পেরেছে এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
রান্না করা খাবার ও মস্তিষ্কের বিকাশ
আগুনের ব্যবহারের ফলে রান্নার প্রচলন শুরু হয়। রান্না করা খাবার হজম করা কাঁচা খাবারের চেয়ে অনেক সহজ। এর ফলে আমাদের শরীরের হজম শক্তির পেছনে ব্যয় হওয়া শক্তির একটি বড় অংশ বেঁচে যায়, যা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করেছে। রান্নার ফলেই আমাদের চোয়ালের হাড় ছোট হয়েছে এবং মস্তিষ্কের আকার বড় হয়েছে। এই পরিবর্তনের ছাপও আমাদের ডিএনএ-তে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
(আরও পড়ুন: মানুষের মূত্রের স্ক্রিস্টাল থেকে ৪৮ কোটি তামার সূচ, মহাকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে এসব! শুনলে চমকে যাবেন)
বর্তমান যুগে আগুনের ডিএনএ-র প্রভাব
হাজার হাজার বছর আগের সেই জিনগত পরিবর্তন আজও আমাদের শরীরে বর্তমান। বর্তমানে আমরা যখন কলকারখানার ধোঁয়া বা সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসি, তখন আমাদের শরীরের সেই আদিম মেকানিজম আমাদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বিবর্তন আমাদের ধোঁয়া সহ্য করার ক্ষমতা দিলেও বর্তমান সময়ের অতিরিক্ত বায়ুদূষণ সেই সীমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
আগুন কেবল একটি বাহ্যিক আবিষ্কার ছিল না, এটি ছিল আমাদের শরীরের ভেতরে ঘটে যাওয়া এক নীরব বিপ্লব। আগুনের শিখাই আমাদের ডিএনএ-কে এমনভাবে গড়েছে যাতে আমরা বুদ্ধিমান ও সহনশীল হয়ে উঠতে পারি। আজকের আধুনিক সভ্যতা সেই আদিম আগুনের কাছে চিরঋণী, যা আমাদের জিনগতভাবে 'মানুষ' হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।