রোমানিয়ার রাজপথে সারিবদ্ধভাবে রাখা শত শত জোড়া লাল জুতো কেবল কোনো শিল্প প্রদর্শনী নয়, বরং এটি একটি নিস্তব্ধ আর্তনাদ। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান নারী হত্যা বা 'ফেমিসাইড' (Femicide)-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই অভিনব পথ বেছে নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

ইউরোপের অন্যতম দেশ রোমানিয়া বর্তমানে এক গভীর সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী হত্যার ঘটনা দেশটিতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানী বুখারেস্টের প্রধান চত্বরে শত শত জোড়া লাল জুতো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রতিটি জুতো এক একজন নিহত নারীর প্রতীক, যাঁদের জীবন কেড়ে নিয়েছে তাঁদেরই পরিচিত কেউ অথবা কোনো নিকটাত্মীয়।
(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
'লাল জুতো' আন্দোলনের প্রতীকী গুরুত্ব
এই আন্দোলনের মূল প্রেরণা এসেছে মেক্সিকোর শিল্পী এলিনা শভেত (Elina Chauvet)-এর কাছ থেকে, যিনি ২০০৯ সালে প্রথমবার নারী হত্যার বিরুদ্ধে লাল জুতোর ব্যবহার করেছিলেন। লাল রঙটি এখানে সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের রক্তের প্রতীক। রোমানিয়ার নারীবাদী সংগঠনগুলো বলছে, দেশে প্রতি বছর বহু নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, কিন্তু বিচারব্যবস্থা এবং পুলিশ প্রশাসনের নির্লিপ্ততা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
রোমানিয়ার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
রোমানিয়ার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
{{/usCountry}}প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠা তথ্য। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রোমানিয়ায় প্রতি বছর কয়েক ডজন নারী তাঁদের সঙ্গী বা প্রাক্তন সঙ্গীর হাতে প্রাণ হারান। কেবল গত এক বছরেই এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ অনেক সময় পারিবারিক বিবাদ বলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যায় এবং ভুক্তভোগী নারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সুরক্ষা কবচ বা 'প্রোটেকশন অর্ডার' থাকা সত্ত্বেও নারীরা রক্ষা পাচ্ছেন না।
(আরও পড়ুন: সকলের নয়, চলন্ত গাড়িতে কারও কারও বমি পায়, পূর্বপুরুষদের বিষাক্ত খাবার খাওয়ার ভুলে এই সমস্যা! বলছে বিজ্ঞান)
বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রোমানিয়ার আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন। বর্তমান আইনে নারী হত্যাকে অনেক সময় আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। বিক্ষোভকারীরা দাবি তুলেছেন যাতে 'ফেমিসাইড' বা 'নারী হত্যা'কে দণ্ডবিধিতে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়াও, ঘরোয়া সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য আরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র এবং জরুরি সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে।
(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনি
রোমানিয়ার এই আন্দোলন কেবল সেই দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই লাল জুতোর ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংহতি প্রকাশ করেছে। এটি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা, যেখানে উন্নত সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে নারীরা আজও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
লাল জুতো দিয়ে সাজানো এই নীরব প্রতিবাদ রোমানিয়ার সমাজকে এক কঠিন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই রক্তের লাল রঙ প্রশাসনের পোশাকে কলঙ্ক হয়েই থাকবে। এই আন্দোলন কেবল বিচার পাওয়ার লড়াই নয়, এটি প্রতিটি নারীর মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের লড়াই।