Injuries Prevention and First Aid Tips: ফিটনেসচর্চা, অবসর সময় খেলাধুলো এবং বিভিন্ন ধরনের সহনশীলতাভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সব বয়সের মানুষই এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় জীবনযাপন করছেন। সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। তবে এর পাশাপাশি খেলাধুলোজনিত চোটের ঘটনাও বাড়ছে। বর্তমানে অর্থোপেডিক চিকিৎসকদের কাছে শুধু পেশাদার খেলোয়াড়ই নন, স্কুলপড়ুয়া শিশু, সপ্তাহান্তে দৌড়ানো মানুষ, শরীরচর্চাকারী এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই খেলাধুলোয় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাও চিকিৎসার জন্য আসছেন।

অনেকের ধারণা, খেলাধুলোজনিত চোট মানেই কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ চোটের পিছনে থাকে দীর্ঘদিনের কিছু ভুল অভ্যেস। ভুল প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, পর্যাপ্ত শারীরিক প্রস্তুতির অভাব, ভুল কৌশলে ব্যায়াম করা, অতিরিক্ত পরিশ্রম অথবা শরীরের দেওয়া প্রাথমিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণেও ধীরে-ধীরে চোট তৈরি হতে পারে।
মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ের কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিক্স ও জয়েন্ট প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসক) সোহম মণ্ডলের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ, শরীরকে উপযুক্তভাবে প্রস্তুত করা এবং সচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ খেলাধুলোজনিত চোট প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ হয়ে ওঠার সময় কমানো যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে হাড় ও অস্থিসন্ধির ক্ষতির ঝুঁকিও কমে।
খেলাধুলোজনিত চোটের সাধারণ কারণ
বিষয়টি নিয়ে মণিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট জানান, শরীর কতটা চাপ সহ্য করার জন্য প্রস্তুত, তার তুলনায় বেশি চাপ পড়লেই সাধারণত খেলাধুলোজনিত চোট লাগে। হঠাৎ করে প্রশিক্ষণের মাত্রা বা সময় বাড়িয়ে দেওয়া, শরীর গরম করার প্রাথমিক ব্যায়াম বাদ দেওয়া (ওয়ার্ম-আপ), দু'বার শরীরচর্চার মধ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে নাড়াচাড়া করা- এসবই চোটের অন্যতম প্রধান কারণ।
অর্থোপেডিক চিকিৎসায় যে ধরনের চোট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে গোড়ালি মচকে যাওয় - গোড়ালিকে স্থির রাখতে সাহায্য করা লিগামেন্টে টান পড়া বা ছিঁড়ে যাওয়া; অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএলের চোট- হাঁটুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলকারী লিগামেন্টের ক্ষতি; মেনিস্কাসের চোট- হাঁটুর ভিতরে কুশনের মতো কাজ করা তরুণাস্থিতে ছিঁড়ে যাওয়া; কাঁধের রোটেটর কাফের চোট- কাঁধকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করা পেশি ও টেন্ডনের ক্ষতি; এবং চাপজনিত হাড়ের সূক্ষ্ম ফাটল - একবারের আঘাতের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে বারবার অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে হাড়ে তৈরি হওয়া ছোটো ফাটল।
{{/usCountry}}অর্থোপেডিক চিকিৎসায় যে ধরনের চোট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে গোড়ালি মচকে যাওয় - গোড়ালিকে স্থির রাখতে সাহায্য করা লিগামেন্টে টান পড়া বা ছিঁড়ে যাওয়া; অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএলের চোট- হাঁটুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলকারী লিগামেন্টের ক্ষতি; মেনিস্কাসের চোট- হাঁটুর ভিতরে কুশনের মতো কাজ করা তরুণাস্থিতে ছিঁড়ে যাওয়া; কাঁধের রোটেটর কাফের চোট- কাঁধকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করা পেশি ও টেন্ডনের ক্ষতি; এবং চাপজনিত হাড়ের সূক্ষ্ম ফাটল - একবারের আঘাতের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে বারবার অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে হাড়ে তৈরি হওয়া ছোটো ফাটল।
{{/usCountry}}এছাড়াও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে হওয়া সমস্যা, যেমন টেনিস এলবো, কনুই ও বাহুর টেন্ডনে অতিরিক্ত চাপের কারণে হওয়া ব্যথা এবং অ্যাকিলিস টেন্ডনের প্রদাহ- পায়ের পেশিকে গোড়ালির সঙ্গে যুক্ত করা টেন্ডনে প্রদাহ, অবসর সময়ে খেলাধুলোয় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও ক্রমশ বাড়ছে।
মাঠে নামার আগেই শুরু হোক চোট প্রতিরোধ
অর্থোপেডিক্স ও জয়েন্ট প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসক জানান, খেলাধুলোজনিত চোট প্রতিরোধের জন্য শুধু সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের উপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন একটি পরিকল্পিত ও নিয়মিত প্রস্তুতি। অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিটের সঠিক ওয়ার্ম-আপের আগে পেশি, টেন্ডন ও অস্থিসন্ধিকে শারীরিক পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত করে। এতে রক্তসঞ্চালন এবং শরীরের নমনীয়তা বৃদ্ধি পায়। একইভাবে ব্যায়ামের শেষে শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কসরৎ করলে পেশির শক্তভাব কমে এবং শরীরকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
প্রতিটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত পেশির শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যায়াম। শক্তিশালী পেশি শরীরের উপর পড়া ধাক্কা আরও ভালোভাবে সামলাতে পারে এবং অস্থিসন্ধি ও লিগামেন্টের উপর চাপ কমায়। তবে প্রশিক্ষণের মাত্রা ধীরে-ধীরে বাড়ানো জরুরি। হঠাৎ করে শরীরচর্চার সময় বা তীব্রতা বাড়ালে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয় না এবং চোটের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন: ফের নিম্নচাপের চোখ রাঙানি! ঝেঁপে বৃষ্টির পূর্বাভাস বাংলার বহু জায়গায়, রইল আবহাওয়ার খবর
খেলার ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত জুতো এবং সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো বা খেলার জন্য অনুপযুক্ত জুতো শরীরের স্বাভাবিক চলাফেরার ধরন পরিবর্তন করে চোটের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বেশি ধাক্কা বা চাপ তৈরি হয় এমন খেলাধুলোএবং ভারী ওজন তোলার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সঠিক কৌশল শেখা জরুরি।
চোটের পর কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা করবেন? কীভাবে বরফ দেবেন?
চোট লাগার পর প্রথম কিছুটা মুহূর্ত অনেক সময় পরবর্তী সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ব্যথা থাকা সত্ত্বেও খেলা চালিয়ে গেলে ছোট চোটও বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। সেই বিষয়ে কয়েকটি টিপস দিয়েছেন মণিপাল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ও জয়েন্ট প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসক।
১) হঠাৎ হওয়া পেশি ও অন্যান্য নরম টিস্যুর চোটের ক্ষেত্রে প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে প্রচলিত আরআইসিই পদ্ধতি- বিশ্রাম, বরফ, চাপ প্রয়োগ এবং আহত অঙ্গ উঁচু করে রাখা- ব্যথা, ফোলাভাব এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
২) বরফ সরাসরি ত্বকের উপর না দিয়ে কাপড়ে মুড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের ব্যবধানে দেওয়া যেতে পারে। ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ দিয়ে প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করা এবং আহত অঙ্গকে হৃদপিণ্ডের স্তরের উপরে তুলে রাখলেও ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।
তবে প্রাথমিক চিকিৎসারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তীব্র ব্যথা, অঙ্গের দৃশ্যমান বিকৃতি, শরীরের ওজন নিতে না পারা, বারবার অস্থিসন্ধি দুর্বল বা অস্থির হয়ে পড়া অথবা দীর্ঘস্থায়ী ফোলাভাব দেখা দিলে দ্রুত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথা নিয়েই খেলা চালিয়ে যাওয়া অথবা চোটের কারণ না জেনে বারবার ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া টিস্যুর ক্ষতি বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে।
শুধু বিশ্রাম নয়, প্রয়োজন সঠিক রিকভারি
খেলোয়াড়দের সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলির একটি হল সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই খেলায় ফিরে যাওয়া। ব্যথা কমে যাওয়া মানেই চোট সম্পূর্ণ সেরে গিয়েছে, সেটা মোটেও নয়। লিগামেন্ট, টেন্ডন এবং হাড়ের সম্পূর্ণ মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। খুব তাড়াতাড়ি খেলায় ফিরে গেলে একই জায়গায় আবার চোট লাগার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ এবং রিকভারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্্পনা অনুসরণ করা উচিত। এর লক্ষ্য হল অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা, পেশির শক্তি পুনর্গঠন করা, শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় ক্ষমতা বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট খেলার প্রয়োজনীয় নড়াচড়ায় ফিরে যাওয়া।
এই সময় সঠিক পুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রোটিন শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়। পর্যাপ্ত জল পান এবং পর্যাপ্ত ঘুমও শরীরের নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মণিপাল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ও জয়েন্ট প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসক অনেকেই শরীরচর্চার সময় হওয়া ব্যথাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে তা উপেক্ষা করেন। কঠোর শরীরচর্চার পরে সাময়িক পেশির ব্যথা হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাকে কখনও স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ফোলাভাব কমতে না চাইলে, বারবার অস্থিসন্ধি বেঁকে গেলে বা হঠাৎ দুর্বল হয়ে এলে, হাঁটু আটকে গেলে, কোনও অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে নাড়ানো না গেলে অথবা বিশ্রামের পরও ব্যথা থেকে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের চিত্রনির্ভর পরীক্ষা বা স্ক্যানের মাধ্যমে দ্রুত রোগ নির্ণয় করা গেলে স্থায়ী অস্থিসন্ধির ক্ষতি হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।
আধুনিক অর্থোপেডিক চিকিৎসায় খেলাধুলোজনিত চোটের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। উন্নত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে করা অস্থিসন্ধির অস্ত্রোপচার, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জীববৈজ্ঞানিক চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে বহু মানুষ নিরাপদে তাঁদের আগের সক্রিয় জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারছেন।
তবে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা এখনও চোট প্রতিরোধ। পেশির শক্তি বাড়ানো, শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখা, বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুসরণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সময় দেওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, হাড়, অস্থিসন্ধি ও পেশিকে সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি।
খেলাধুলো ও শারীরিক সক্রিয়তা আমাদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য, স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার জন্য নয়। সঠিক প্রস্তুতি, চোটের পর দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নিয়ম মেনে পুনর্বাসনের মাধ্যমে অধিকাংশ খেলাধুলোজনিত চোট কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর ফলে সক্রিয় জীবনযাপন বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে হাড়, অস্থিসন্ধি ও পেশির সুস্থতাও সুরক্ষিত রাখা যায়।