Success Story: কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক দূরদর্শিতা থাকলে যে ভাগ্যের চাকা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, তার এক প্রমাণ হলেন আর. জি. চন্দ্রমোগান। তামিলনাড়ুর এক সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষটা আজ ভারতের ডেয়ারি শিল্পের শীর্ষ মুকুটহীন সম্রাট। ‘অরুণ আইসক্রিম’ এবং দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ডেয়ারি সংস্থা ‘হ্যাটসান অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস’-র মূল কারিগর তিনিই। কিন্তু এই সাফল্যের রাস্তা মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ৬৫ টাকা বেতনের এক সাধারণ কর্মচারী থেকে আজ প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকার এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার গল্পটি যে কোনও সাধারণ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখাবে।

১৯৫৬ সালে চন্দ্রমোগানের বাবা সপরিবারে চেন্নাইয়ে আসেন এবং সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের কাছে একটি মুদির দোকান খোলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৯৬৮ সালে সেই ব্যবসাটি সম্পূর্ণ লোকসানের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারকে আবার নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতে হয়। চন্দ্রমোগানের পড়াশোনার জীবনও খুব একটা মসৃণ ছিল না।
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রি-ইউনিভার্সিটির গণিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এরপর পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে এবং নিজের জীবনে শৃঙ্খলা আনতে তাঁর বাবা তাঁকে তামিলনাড়ুর ভিলুপুরমের একটি কাঠের ডিপোতে শিক্ষানবিশ বা অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজে ঢুকিয়ে দেন। সেখানে চন্দ্রমোগানের মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬৫ টাকা। মাত্র এক বছর সেখানে কাজ করার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে অন্যের অধীনে কাজ করে জীবনের বড় লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে তিনি আবার চেন্নাইয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
মাত্র ১৩,০০০ টাকা মূলধন ও ২৫০ বর্গফুট থেকে শুরু
১৯৭০ সালে চন্দ্রমোগানের বয়স তখন মাত্র ২১। নিজের ব্যবসা শুরু করার তীব্র জেদ তাঁর মনে। কিন্তু মূলধন কোথায়? শেষে তাঁর বাবা পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে মাত্র ১৩,০০০ টাকা তাঁর হাতে তুলে দেন। এই সামান্য পুঁজি সম্বল করেই চেন্নাইয়ের রয়াপুরম এলাকায় মাত্র ২৫০ বর্গফুটের একটি ছোটো ঘর ভাড়া নেন তিনি। সেখানে একটি সাধারণ বরফ তৈরির মেশিন বসিয়ে মাত্র তিনজন কর্মচারী নিয়ে শুরু হয় ‘অরুণ আইসক্রিম’-র যাত্রা।
{{/usCountry}}১৯৭০ সালে চন্দ্রমোগানের বয়স তখন মাত্র ২১। নিজের ব্যবসা শুরু করার তীব্র জেদ তাঁর মনে। কিন্তু মূলধন কোথায়? শেষে তাঁর বাবা পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে মাত্র ১৩,০০০ টাকা তাঁর হাতে তুলে দেন। এই সামান্য পুঁজি সম্বল করেই চেন্নাইয়ের রয়াপুরম এলাকায় মাত্র ২৫০ বর্গফুটের একটি ছোটো ঘর ভাড়া নেন তিনি। সেখানে একটি সাধারণ বরফ তৈরির মেশিন বসিয়ে মাত্র তিনজন কর্মচারী নিয়ে শুরু হয় ‘অরুণ আইসক্রিম’-র যাত্রা।
{{/usCountry}}শুরুর দিকে প্রতিদিন প্রায় ১০,০০০ স্টিক আইসক্রিম বা আইসক্যান্ডি তৈরি হত। সেই সময়ে বাজারে টিকে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তৎকালীন সময় ভারতের আইসক্রিম বাজার মূলত অসংগঠিত ছিল এবং প্রায় ৪০,০০০ ছোটো-বড় কুটির শিল্প এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
নিজের হাতে ঠেলাগাড়ি ঠেলে আইসক্রিম বিক্রি
ব্যবসার শুরুর দিনগুলিতে কোনও বড় শোরুম বা ডিস্ট্রিবিউটর ছিল না। চন্দ্রমোগান নিজেই চেন্নাইয়ের রাস্তায়-রাস্তায় ঠেলাগাড়ি ঠেলে ঘুরে ঘুরে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। অত্যন্ত কম লভ্যাংশ বা প্রফিট মার্জিনে তিনি গুণগত মানের দিকে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের রুচি ও ঘরের চাহিদাকে বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন। রাস্তায় ঘুরে-ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে বাজারের আসল চাহিদা বুঝতে সাহায্য করে। ধীরে-ধীরে তাঁর তৈরি ব্র্যান্ড ‘অরুণ আইসক্রিম’ চেন্নাইয়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের মধ্যে যেখানে প্রথম বছরে ব্যবসার টার্নওভার ছিল মাত্র ১.৫ লাখ টাকা, তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটিতে।
আরও পড়ুন: Success Story: একাদশে ৩৪% নম্বর, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সময় ২৪ বার ব্যাকলগ, সেই সমীরই হলেন IPS অফিসার
আইসক্রিম থেকে ডেয়ারি সাম্রাজ্য: 'হ্যাটসান'-এর জন্ম
টানা ১০ বছর সফলভাবে আইসক্রিম ব্যবসা চালানোর পর চন্দ্রমোগান বুঝতে পারেন যে, আসল সুযোগ লুকিয়ে রয়েছে তরল দুধ ও অন্যান্য ডেয়ারি প্রোডাক্টের বিশাল বাজারে। তামিলনাড়ুর হাজার-হাজার দুগ্ধ চাষিদের সঙ্গে তাঁর প্রতিনিয়ত যোগাযোগের সুবাদে তিনি কাঁচা দুধ সংগ্রহের একটি মজবুত নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।
১৯৮৬ সালে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন ‘হ্যাটসান অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস’-কে। এরপর আইসক্রিমের পাশাপাশি বাজারে আসে ‘আরোক্য’ ব্র্যান্ডের দুধ, দই, ঘি এবং মাখনের মতো প্রয়োজনীয় নিত্যদিনের পণ্য। চাষিদের থেকে সরাসরি দুধ সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তা প্রক্রিয়াকরণ করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এই সুশৃঙ্খল সাপ্লাই চেইনের কারণেই হ্যাটসান আজ ভারতের বৃহত্তম প্রাইভেট ডেয়ারি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।
আজকের ২০,০০০ কোটি টাকার সাফল্য
২০২৬ সালের আর্থিক খতিয়ান এবং শেয়ার বাজারের তথ্য অনুযায়ী, আর. জি. চন্দ্রমোগানের হ্যাটসান অ্যাগ্রো প্রোডাক্টসের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বা বাজার মূল্য ২০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভারতের ১.৪ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের বাজারে তিনি আজ একজন সফল বিলিয়নেয়ার, যাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ ১.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বর্তমানে এই সংস্থায় প্রায় ৮,০০০-এর বেশি মানুষ সরাসরি কর্মরত। ২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান ডেয়ারি অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্যাট্রোনেজ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে। ৬৫ টাকার চাকরি করা এক কলেজ ড্রপআউট যুবকের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তর প্রমাণ করে যে- সঠিক ব্যবসায়িক বুদ্ধি, হার না মানা মানসিকতা এবং ধৈর্য থাকলে শূন্য থেকেও আকাশছোঁয়া সাফল্য পাওয়া সম্ভব।