প্রকৃতির রহস্যময় জগতের এক রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা আতঙ্কের অধ্যায় হলো পরজীবী ছত্রাক ও পোকামাকড়ের লড়াই। জনপ্রিয় গেম এবং সিরিজ 'দ্য লাস্ট অফ আস' (The Last of Us)-এ আমরা দেখেছি কীভাবে একটি ছত্রাক মানুষকে ‘জম্বি’ বানিয়ে ফেলে। বাস্তবে মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা না ঘটলেও, পতঙ্গ রাজ্যে এটি এক কঠোর বাস্তবতা। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউ (Indian Defence Review)-তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এক বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা এবং ছত্রাকের এই মরণপণ লড়াইয়ের কাহিনি উঠে এসেছে।

প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই কেবল শিকারি আর শিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও কখনও এই লড়াই হয় শরীরের ভেতরে, স্নায়ুতন্ত্রের দখল নিয়ে। ‘দ্য লাস্ট অফ আস’ সিরিজের কাল্পনিক কর্ডিসেপস (Cordyceps) ছত্রাকের মতোই বাস্তবেও কিছু ছত্রাক রয়েছে যারা মাকড়সাকে আক্রমণ করে এবং তাদের শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এই প্রক্রিয়াটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনই শিউরে ওঠার মতো।
(আরও পড়ুন: গায়ের গন্ধ পেলেই ‘মাতাল’, তার পরেই কামড়! ১০,০০০ বছর ধরে এই চলে আসছে, অথচ তার আগে রক্তই খেত না মশা, বলছে গবেষণা)
ছত্রাকের আক্রমণ: শরীরের ভেতর এক অদৃশ্য শত্রু
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এক বিশেষ ধরণের এন্টোমোপ্যাথোজেনিক (Entomopathogenic) ছত্রাক যখন কোনো মাকড়সাকে আক্রমণ করে, তখন সেটি মাকড়সার শক্ত বহিঃকঙ্কাল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে। এই ছত্রাক কেবল মাকড়সাটিকে মেরে ফেলে না, বরং তার পেশি এবং স্নায়ুতন্ত্রের দখল নেয়। একে বলা হয় ‘জম্বিফাইং’ প্রক্রিয়া। ছত্রাকটি মাকড়সার শরীরের পুষ্টি শোষণ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্ককে এমনভাবে পরিচালনা করে যাতে মাকড়সাটি তার স্বাভাবিক আচরণ ভুলে যায়।
(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
মাকড়সার অদ্ভুত আচরণ ও মৃত্যুর ফাঁদ
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম বলেই এগিয়ে গেলাম আমরা, পিছিয়ে গেল অন্য প্রজাতি! শরীরটাও বদলে গেল ভিতর থেকে, বলছে হালের গবেষণা)
মাকড়সার অদ্ভুত আচরণ ও মৃত্যুর ফাঁদ
{{/usCountry}}ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর মাকড়সাটি এক প্রকার সম্মোহিতের মতো আচরণ শুরু করে। সে এমন এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয় যেখানে বাতাসের প্রবাহ বেশি এবং উচ্চতা বেশি। এটি ছত্রাকের একটি সুপরিকল্পিত চাল। উপযুক্ত জায়গায় পৌঁছানোর পর ছত্রাকটি মাকড়সার শরীর থেকে অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। মাকড়সার মাথা বা পিঠ ফেটে লম্বা শুঁড়ের মতো ছত্রাক বেরিয়ে আসে, যা দেখতে অনেকটা ভুতুড়ে লাগে। এই শুঁড় থেকে লক্ষ লক্ষ ছত্রাকের স্পোর (Spores) বাতাসে ভেসে যায় এবং আশেপাশে থাকা অন্য মাকড়সাদেরও সংক্রমিত করে।
(আরও পড়ুন: সকলের নয়, চলন্ত গাড়িতে কারও কারও বমি পায়, পূর্বপুরুষদের বিষাক্ত খাবার খাওয়ার ভুলে এই সমস্যা! বলছে বিজ্ঞান)
মাকড়সা কি পাল্টা লড়াই করতে পারে?
ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকৃতিতে এই লড়াই একতরফা নয়। অনেক সময় মাকড়সারা তাদের নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘ইমিউন রেসপন্স’ ব্যবহার করে এই ছত্রাককে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এছাড়া সামাজিক মাকড়সাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা তাকে দল থেকে আলাদা করে দেয় যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। একে বলা হয় ‘সোশ্যাল ইমিউনিটি’।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
এই গবেষণার গুরুত্ব ও প্রতিরক্ষা প্রেক্ষিত
পোকামাকড়ের এই জৈবিক লড়াই কেন একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক পোর্টালে গুরুত্ব পাচ্ছে? উত্তরটি হলো বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা জৈবিক অস্ত্র। ছত্রাক যেভাবে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে (Host) আক্রমণ করে তার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে কৌশলগত গবেষণার বিষয়। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই ছত্রাকগুলো প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে, যা কৃষিক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
‘দ্য লাস্ট অফ আস’ কেবল একটি গল্প নয়, এটি প্রকৃতির এক রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। মাকড়সা এবং ছত্রাকের এই জীবন-মরণের খেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এখনও প্রকৃতির অনেক রহস্যই জানি না। ক্ষুদ্র এক ছত্রাক যেভাবে একটি জটিল প্রাণীর মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা বিজ্ঞানের কাছে এক পরম বিস্ময়।