বারাণসী থেকে বাংলার জমিদার বাড়ি, ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গেও যোগ আছে অন্নপূর্ণা পুজোর
কাশী বা বারাণসীকে দেবী অন্নপূর্ণার প্রধান ক্ষেত্র বলা হলেও, বাংলায় এই পুজোর প্রসার ঘটে মূলত মধ্যযুগের শেষ ভাগে এবং আধুনিক যুগের শুরুতে। বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোর প্রবর্তন এবং জনপ্রিয়তার নেপথ্যে রয়েছে ভক্তি, আভিজাত্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক মেলবন্ধন।
চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বসন্তের বাতাসে যখন বাসন্তী পুজোর আমেজ, তখনই বাঙালির ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয় মা অন্নপূর্ণার আরাধনা। দেবী অন্নপূর্ণা হলেন অন্ন ও প্রাচুর্যের অধিষ্ঠাত্রী। বঙ্গদেশে এই পুজোর ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনই এর বিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার জমিদারী সংস্কৃতি এবং ব্রিটিশ শাসনের এক বিশেষ অধ্যায়।

কাশী বা বারাণসীকে দেবী অন্নপূর্ণার প্রধান ক্ষেত্র বলা হলেও, বাংলায় এই পুজোর প্রসার ঘটে মূলত মধ্যযুগের শেষ ভাগে এবং আধুনিক যুগের শুরুতে। বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোর প্রবর্তন এবং জনপ্রিয়তার নেপথ্যে রয়েছে ভক্তি, আভিজাত্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক মেলবন্ধন।
(আরও পড়ুন: শুক্রের মেষ রাশিতে গোচর, এপ্রিল থেকে ভাগ্য উজ্জ্বল হবে ৩ রাশির! মিলবে আকস্মিক ধনলাভ ও বিলাসবহুল জীবন)
বঙ্গদেশে অন্নপূর্ণা পুজোর সূচনা
বাংলার লোকগাথা অনুযায়ী, দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচারের ক্ষেত্রে সবথেকে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি ভারতচন্দ্র তাঁর অমর কাব্য 'অন্নদামঙ্গল'-এ দেবীর রূপ বর্ণনা করেছিলেন। কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রই প্রথম বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরবর্তীকালে কলকাতার বহু বনেদি পরিবার, যেমন শোভাবাজার রাজবাড়ি বা জোড়াসাঁকোর কোনো কোনো পরিবারে এই পুজোর প্রচলন হয়। মূলত জমিদারদের আভিজাত্য প্রদর্শনের একটি মাধ্যম হিসেবেও চৈত্র মাসের এই অষ্টমী তিথিটি বিশেষ গুরুত্ব পেতে থাকে।
(আরও পড়ুন: পরের মাস থেকেই উজ্জ্বল হবে ৩ রাশির ভাগ্য, মিলবে রাজকীয় সম্মান ও অঢেল সম্পদ! নেপথ্যে শুক্রাদিত্য রাজযোগ)
ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে অন্নপূর্ণা পুজোর সম্পর্ক
অন্নপূর্ণা পুজোর সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের সম্পর্কটি সরাসরি ধর্মীয় না হলেও, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত গভীর।
১. দুর্ভিক্ষের প্রতিবাদ ও অন্নের সংস্থান:
ব্রিটিশ শাসন আমল, বিশেষ করে ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় বাংলা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছিল। ইংরেজদের অতিরিক্ত রাজস্ব নীতি এবং শস্য মজুত করার ফলে সাধারণ মানুষ যখন অন্নহীন হয়ে মরছিল, তখন বাংলার হিন্দু জমিদাররা ‘অন্নদাত্রী’ মায়ের আরাধনার মাধ্যমে এক প্রকার আধ্যাত্মিক প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। অন্নপূর্ণা পুজোর একটি প্রধান অঙ্গ হলো 'অন্নদান'। ব্রিটিশদের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের মুখে দাঁড়িয়ে জমিদাররা তাঁদের ভাঁড়ার খুলে দিতেন সাধারণ মানুষের জন্য। পুজোর মণ্ডপগুলো হয়ে উঠত অন্ন বিতরণের প্রধান কেন্দ্র।
২. আভিজাত্য ও ব্রিটিশদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা:
১৮শ ও ১৯শ শতকে কলকাতার ‘বাবু’ সংস্কৃতির উত্থান ঘটে। এই সময় অনেক ধনী বাঙালি পরিবার ব্রিটিশ সাহেবদের আপ্যায়ন করার জন্য যেমন দুর্গাপূজা করতেন, তেমনই নিজেদের ধার্মিক ভাবমূর্তি ও আভিজাত্য বজায় রাখতে অন্নপূর্ণা পুজোর আয়োজন করতেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও এই জাঁকজমকপূর্ণ পুজো দেখতে আমন্ত্রিত হতেন। তবে অন্নপূর্ণা পুজো ছিল মূলত অন্দরের এবং আভিজাত্যের প্রতীক, যেখানে ব্রিটিশদের উপস্থিতিতেও বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা থাকত।
৩. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও চৈত্র সংক্রান্তি:
ব্রিটিশ আমলে বাংলার অর্থবছর শেষ হতো চৈত্র মাসে। কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের পর চৈত্র মাসের শেষ দিকে জমিদাররা এই উৎসবের আয়োজন করতেন। একদিকে এটি ছিল প্রজাদের খুশ করার মাধ্যম, অন্যদিকে ছিল ব্রিটিশ সরকারকে নিজেদের সমৃদ্ধি দেখানো। অন্নপূর্ণা পুজোকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরণের সচলতা আসত, যা ব্রিটিশদের কর আদায়ের পর নিঃস্ব হওয়া বাংলার মানুষের জন্য ছিল এক পরম আশীর্বাদ।
(আরও পড়ুন: একবার ‘জয় তারা’ বলে ডেকে উঠে বৃষ্টি থামিয়েছিলেন বামাক্ষেপা! সেই ঘটনার কথা জানেন কি)
অন্নপূর্ণা পুজোর আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য
পুরাণ মতে, মা অন্নপূর্ণা হলেন জগতমাতা পার্বতীরই একটি রূপ। যখন মহাদেব জগতকে মায়া বলে ঘোষণা করেন এবং দেবী অন্তর্হিত হওয়ায় পৃথিবীতে হাহাকার শুরু হয়, তখন শিব নিজের ভুল বুঝতে পেরে দেবীর কাছে অন্ন ভিক্ষা করেন। এই ভিক্ষা গ্রহণের দৃশ্যটি আজও অন্নপূর্ণা পুজোর প্রতিমায় মূর্ত হয়ে থাকে। অন্নপূর্ণা পুজো আমাদের শেখায় যে, ক্ষুধার সামনে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই সমান।
(আরও পড়ুন: ৩ দিন পর থেকে মহালক্ষ্মী রাজযোগ, চন্দ্র ও মঙ্গলের মিলনে ফিরবে ৩ রাশির ভাগ্য! ধনলাভের প্রবল যোগ)
বঙ্গদেশে অন্নপূর্ণা পুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি ছিল ব্রিটিশ শাসিত বাংলার এক ক্রান্তিকালের সামাজিক দলিল। অভাব আর দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে ভক্তি ও অন্নের শক্তির এই আরাধনা আজও বাঙালির ঘরে ঘরে প্রদীপ শিখার মতো জ্বলছে। এই পুজো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের সবথেকে বড় ধর্ম হলো ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











