একবার ‘জয় তারা’ বলে ডেকে উঠে বৃষ্টি থামিয়েছিলেন বামাক্ষেপা! সেই ঘটনার কথা জানেন কি
বামাক্ষেপার এই অলৌকিক ঘটনার কথা শুনলে আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। সেদিন কী এমন ঘটেছিল, যা মানুষকে হতবাক করে দেয়? জেনে নিন অলৌকিক শক্তিধর সেই মহাসাধকের কাহিনি।
বীরভূম জেলার তারাপীঠ আর সাধক বামাক্ষ্যাপা—এই দুটি নাম একে অপরের পরিপূরক। তারাপীঠের শ্মশানে মা তারার কোলের পাগল ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন বামাক্ষ্যাপা। তাঁকে নিয়ে প্রচলিত হাজারো অলৌকিক কাহিনির মধ্যে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হলো তাঁর যোগবলে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থামিয়ে দেওয়ার কাহিনি। ভক্তদের বিশ্বাস, একবার মায়ের সেবায় বাধা আসায় স্বয়ং প্রকৃতিকেও শান্ত হতে বাধ্য করেছিলেন এই মহাসাধক।

বামাক্ষ্যাপার সেই অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় এবং তারাপীঠের সেই বিশেষ ঘটনার কথা শুনলে এখনও অনেকের গায়ে কাঁটা দেয়। জেনে নিন সেই কাহিনি।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত তারাপীঠ মহাশ্মশান। এখানকার ধূলিকণায় আজও যেন মিশে আছেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন মা তারার এমন এক একনিষ্ঠ ভক্ত, যাঁর কাছে মা ছিলেন রক্তমাংসের এক জীবন্ত সত্তা। কথিত আছে, একবার তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে থমকে গিয়েছিল প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
(আরও পড়ুন: প্রবল ঝড়ের মধ্যে পড়া নৌকাকে অলৌকিক ক্ষমতায় বাঁচান লোকনাথ বাবা! কী ঘটেছিল সেদিন)
ঝোড়ো রাতে মায়ের সেবার আয়োজন
ঘটনাটি ছিল এক দুর্যোগপূর্ণ বিকেলের। আকাশ কালো করে ঘন মেঘ জমেছিল তারাপীঠের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো প্রবল বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় আর অঝোরে বৃষ্টি। সেই দিনটি ছিল দেবী তারার বিশেষ পুজোর দিন। মন্দিরের সেবাইত থেকে শুরু করে অগণিত ভক্ত—সবাই দুশ্চিন্তায় মগ্ন। বৃষ্টির দাপটে মন্দিরের প্রদীপ জ্বালানো থেকে শুরু করে মায়ের ভোগ নিবেদন—সবকিছুই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শোনা যায়, তারাপীঠের সেই সময়কার কুঁড়েঘর সদৃশ মন্দিরগুলো বৃষ্টির জলে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নদী ফুঁসে উঠেছিল এবং চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছিল। সেবাইতরা যখন হাল ছেড়ে দিয়ে বসেছিলেন যে আজ হয়তো মায়ের সন্ধ্যারতি বা ভোগ নিবেদন সম্ভব হবে না, তখনই দৃশ্যপটে উদয় হলেন 'ক্ষ্যাপা বাবা'।
(আরও পড়ুন: রহস্যের সমাধান আজও হয়নি! স্বয়ং লোকনাথ বাবা নাকি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ছবির)
‘জয় তারা’ ধ্বনি ও প্রকৃতির নীরবতা
বামাক্ষ্যাপা তখন শ্মশানের এক গাছের নিচে বসে আপন মনে ধুনী জ্বালিয়ে মা তারার নাম জপ করছিলেন। বৃষ্টির ঝাপটায় তাঁর ধুনী নিভে যাচ্ছিল বারবার। অন্যদিকে মন্দিরের দুরবস্থা দেখে তাঁর মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর মায়ের সেবায় বিঘ্ন ঘটছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বামাক্ষ্যাপা হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠলেন। তাঁর দুচোখে তখন এক অলৌকিক জ্যোতি। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দুহাত তুলে সজোরে গর্জে উঠলেন— "জয় তারা! জয় তারা!"। সেই কণ্ঠস্বর বনের পশুপাখি থেকে শুরু করে গ্রামবাসীদের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ আহ্বানের পর মুহূর্তেই ঝোড়ো হাওয়ার বেগ কমতে শুরু করল। যে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল, তা হঠাৎ করেই মন্দিরের ওপর থেকে সরে গিয়ে দূরে কোথাও চলে গেল। মনে হলো যেন অদৃশ্য কোনো ছাতা তারাপীঠের মন্দিরের ওপর এক সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে।
(আরও পড়ুন: মৃত ভেবে সাজানো হয়েছিল চিতা! তার পরেও অলৌকিক ভাবে বেঁচে ওঠেন লোকনাথ বাবা)
যোগবলের প্রভাব ও মায়ের সেবা
সেদিন সেই দুর্যোগের মাঝেও মন্দিরের প্রদীপ নেভেনি। বামাক্ষ্যাপা নিজে মন্দিরে গিয়ে মায়ের ভোগ এবং সেবার সুব্যবস্থা করালেন। ভক্তরা অবাক হয়ে দেখলেন, আকাশজুড়ে মেঘ থাকলেও তারাপীঠের পবিত্র ভূমিতে বৃষ্টির একটি ফোঁটাও তখন পড়ছে না। সেবাইতরা নির্বিঘ্নে মায়ের পূজা সম্পন্ন করলেন। লোকমুখে প্রচলিত যে, বামাক্ষ্যাপা প্রকৃতিকে আদেশ দিয়েছিলেন— "যতক্ষণ আমার মা খাওয়া শেষ না করছেন, ততক্ষণ তুই থামবি!"
পূজা এবং ভোগ নিবেদন শেষ হওয়ার পর বামাক্ষ্যাপা যখন শান্ত হয়ে পুনরায় শ্মশানে তাঁর আসনের দিকে ফিরে গেলেন, ঠিক তখনই আবার প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল। কিন্তু ততক্ষণে মায়ের সেবা সুসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
(আরও পড়ুন: কাচের টুকরো কপালে ফুটিয়ে ভৈরবী জ্ঞান পান ঠাকুর! সাধক তোতাপুরী ও রামকৃষ্ণ দেবের সাক্ষাতের সেই ঘটনাটি জানেন কি)
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
এই কাহিনী কেবল একটি অলৌকিক গল্প নয়, এটি হলো একজন ভক্তের ওপর ভগবানের সেই অমোঘ টানের নিদর্শন। বামাক্ষ্যাপার কাছে ভক্তি ছিল যুক্তির ঊর্ধ্বে। যোগশাস্ত্রে বলা হয়, যখন কোনো সাধক সম্পূর্ণভাবে অহংকারমুক্ত হয়ে ইষ্টের সাথে লীন হয়ে যান, তখন প্রকৃতির পঞ্চভূতও তাঁর আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠে। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন সেই স্তরেরই এক সিদ্ধ পুরুষ।
(আরও পড়ুন: জন্মের আগেই নাকি পিতাকে দেখা দিয়েছিলেন ঠাকুর! শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ঘটনাটা জানেন কি)
আজও তারাপীঠের ভক্তরা বিপদে পড়লে 'জয় তারা' বলে ডাক দেন এই বিশ্বাসে যে, তাঁদের ক্ষ্যাপা বাবা আজও আছেন। তাঁর সেই বৃষ্টির দিনটির কাহিনী আজও মানুষের মনে ভক্তি আর বিস্ময় জাগিয়ে তোলে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিখাদ বিশ্বাসের কাছে প্রকৃতির রুদ্ররূপও হার মানতে বাধ্য।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











