মহাভারতের বীর চেকিতানের কথা অনেকেই ভুলে গিয়েছেন, অথচ তিনি না থাকলে পাণ্ডবদের যুদ্ধ জয় কঠিন হত
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চেকিতানের পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন বৃষ্ণিবংশের যদুবীর এবং রাজা শ্রুতকীর্তির পুত্র। সম্পর্কে তিনি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে আমরা অর্জুন, কর্ণ বা ভীষ্মের মতো মহাবীরদের কথা বারংবার শুনলেও, এমন কিছু বীর যোদ্ধা ছিলেন যাঁদের শৌর্য ও ত্যাগ ইতিহাসের পাতায় কিছুটা অন্তরালেই রয়ে গেছে। এমনই এক তেজস্বী যোদ্ধা হলেন বৃষ্ণিবংশীয় রাজা চেকিতান। শ্রীকৃষ্ণের আত্মীয় এবং পাণ্ডবদের একনিষ্ঠ মিত্র চেকিতান কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা মহাকাব্যের যুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চেকিতানের পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন বৃষ্ণিবংশের যদুবীর এবং রাজা শ্রুতকীর্তির পুত্র। সম্পর্কে তিনি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রণদামামা বেজে উঠল, তখন যদুবংশীয় অনেক বীরই নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছিলেন কিংবা দুর্যোধনের ‘নারায়ণী সেনা’র অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু চেকিতান ছিলেন সেই বিরল যদুবীরদের একজন, যিনি সরাসরি পাণ্ডবদের পক্ষাবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নেন।
(আরও পড়ুন: রামায়ণের রহস্যময় রাক্ষস কবন্ধ! মাথা ও ঘাড়হীন এক দানব, রাম-লক্ষ্মণের হাতে মৃত্যুতেই লুকিয়ে ছিল তাঁর মুক্তি)
পাণ্ডবদের একনিষ্ঠ মিত্র ও সেনাপতি
চেকিতান কেবল একজন সাধারণ যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘মহারথী’। পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী সেনার মধ্যে একটি অক্ষৌহিণী সেনার অধিপতিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল তাঁর ওপর। যুধিষ্ঠিরের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মানসিকতা তাঁকে কুরুক্ষেত্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেনাপতিতে পরিণত করেছিল।
(আরও পড়ুন: ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিলেন দেবী ভ্রমরী! তান্ত্রিক মতে, নাদ সাধনায় হয় তাঁর পুজো, কেন তাঁর উপাসনা অত্যন্ত গুহ্য)
রণক্ষেত্রের বীরত্ব ও শৌর্য
কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিনের যুদ্ধে চেকিতান অসংখ্যবার কৌরবদের ব্যূহ তছনছ করে দিয়েছিলেন। দ্রোণপর্ব এবং কর্ণপর্বে তাঁর বীরত্বের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়।
- দুঃশাসনের সাথে যুদ্ধ: যুদ্ধের প্রথম দিকেই চেকিতান দুঃশাসনের মুখোমুখি হন এবং তাঁকে প্রবল পরাক্রমে পরাজিত করেন।
- দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে লড়াই: চেকিতান এতই সাহসী ছিলেন যে তিনি স্বয়ং আচার্য দ্রোণের রথের ঘোড়াগুলোকে বধ করেছিলেন এবং দ্রোণাচার্যকে কিছুক্ষণের জন্য বিচলিত করে তুলেছিলেন।
- ভীষ্মের সাথে সংঘাত: ভীষ্মের প্রবল বাণবৃষ্টির সামনেও চেকিতান অটল ছিলেন এবং পাণ্ডব সেনাদের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করেছিলেন।
(আরও পড়ুন: অত্যন্ত রহস্যময়ী এবং শক্তিশালী দেবী কাটেরি আম্মান, তাঁকে সকলে এত ভয় পান কেন? কী বলছে তন্ত্রশাস্ত্র)
কবন্ধ ও দুর্যোধনের সাথে দ্বৈরথ
চেকিতানের তলোয়ার চালানোর কৌশল ছিল কিংবদন্তি। গদা যুদ্ধেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে শল্য এবং দুর্যোধনের সাথেও তাঁর প্রবল সংঘর্ষ ঘটে। বীর চেকিতান বহুবার কৌরব মহারথীদের প্রাণসংশয় তৈরি করেছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে পাণ্ডবদের যদুবংশীয় শক্তির একটি বড় ভরসা ছিল।
চেকিতানের অন্তিম পরিণতি
দুর্ভাগ্যবশত, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে চেকিতান বীরগতি প্রাপ্ত হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে যখন দুর্ধর্ষ কৃপাচার্যের সাথে তাঁর যুদ্ধ বাঁধে, তখন সেই দ্বৈরথে কৃপাচার্যের বাণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শেষে যে কতিপয় বীর পাণ্ডব শিবিরের হয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, চেকিতান তাঁদের অন্যতম।
(আরও পড়ুন: মহাদেবের তৃতীয় চোখের আগুনে এদিন পুড়ে গিয়েছিলেন কামদেব! কেন দোলের দিনেই এমন ঘটনা ঘটেছিল)
চেকিতানের চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে, যখন ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াই হয়, তখন নিজের বংশ বা আত্মীয়তার চেয়েও বড় ধর্ম হলো সত্যের পাশে দাঁড়ানো। শ্রীকৃষ্ণের আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর আদর্শের কারণে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আধুনিক যুগেও চেকিতানের মতো চরিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসে প্রচারের আলো কম থাকলেও বীরত্বের মহিমা কোনো অংশে ম্লান হয় না।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











