রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরে কীভাবে বাসন্তী পুজো পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার ঘরে ঘরে? জানুন সেই কাহিনি
পুরাণ মতে, ত্রেতাযুগে রাজা সুরথ বসন্তকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বঙ্গদেশে এই পুজোর যে রূপ আমরা দেখি, তার পিছনে রয়েছে বাংলার জমিদারী প্রথা এবং ব্রিটিশ রাজত্বের এক ভিন্ন ইতিহাস।
চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের শুরুতেই আকাশ-বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ। প্রকৃতি যখন পলাশ আর শিমুলের রঙে রঙিন, তখনই মর্ত্যে শুরু হয় আদি দুর্গাপূজা বা বাসন্তী পুজো। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে শারদীয়া দুর্গোৎসবের দাপটে বাসন্তী পুজো কিছুটা ম্লান হলেও, এর ঐতিহাসিক শিকড় অনেক গভীরে। বিশেষ করে বঙ্গদেশে এই পুজোর প্রসার এবং এর সাথে ব্রিটিশ শাসনের এক অদ্ভুত সংযোগ রয়েছে, যা আজও অনেকের অজানা।

(আরও পড়ুন: বারাণসী থেকে বাংলার জমিদার বাড়ি, ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গেও যোগ আছে অন্নপূর্ণা পুজোর)
পুরাণ মতে, ত্রেতাযুগে রাজা সুরথ বসন্তকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বঙ্গদেশে এই পুজোর যে রূপ আমরা দেখি, তার পিছনে রয়েছে বাংলার জমিদারী প্রথা এবং ব্রিটিশ রাজত্বের এক ভিন্ন ইতিহাস।
বঙ্গদেশে বাসন্তী পুজোর আদি চল
বাঙালির ঘরে ঘরে বাসন্তী পুজো মূলত সাবেকি ঐতিহ্যের বাহক। মনে করা হয়, মধ্যযুগে নদীয়ার রাজবাড়িতে এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার প্রাচীন জনপদগুলোতে বাসন্তী পুজো অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হতো। বিশেষ করে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ এবং নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পুজোর প্রসারে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। শরৎকালের শারদীয়া পুজো যেহেতু শ্রীরামচন্দ্রের ‘অকালবোধন’, তাই অনেক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবার মনে করতেন চৈত্র মাসের পুজোই হলো বিধিসম্মত এবং শাস্ত্রীয়। এই কারণেই বাংলার বনেদি পরিবারগুলোতে বাসন্তী পুজোর চল বাড়ে।
(আরও পড়ুন: একবার ‘জয় তারা’ বলে ডেকে উঠে বৃষ্টি থামিয়েছিলেন বামাক্ষেপা! সেই ঘটনার কথা জানেন কি)
ব্রিটিশ শাসনের সাথে বাসন্তী পুজোর সম্পর্ক
বাসন্তী পুজোর সাথে ব্রিটিশ শাসনের সম্পর্কটি সরাসরি ধর্মীয় নয়, বরং আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক।
১. জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ১৮শ এবং ১৯শ শতকে ব্রিটিশদের শাসনের বিরুদ্ধে যখন বাঙালির মনে জাতীয়তাবোধ দানা বাঁধতে শুরু করে, তখন বাসন্তী পুজো হয়ে ওঠে শক্তি আরাধনার অন্যতম মাধ্যম। যেহেতু চৈত্র মাস বাংলার কৃষিভিত্তিক ক্যালেন্ডারে বছরের শেষ (চৈত্র সংক্রান্তির আগে), তাই জমিদাররা তাঁদের প্রজাদের একজোট করার জন্য এই সময়টিকে বেছে নিতেন। ব্রিটিশদের চোখ এড়াতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে চলত অনেক বিপ্লবী পরিকল্পনা।
২. শারদীয়া পুজোর প্রাধান্য বৃদ্ধি: মজার বিষয় হলো, ব্রিটিশ শাসনামলেই বাসন্তী পুজোর জৌলুস কমতে শুরু করে এবং শারদীয়া দুর্গোৎসবের আধিপত্য বাড়ে। ব্রিটিশ কোম্পানি শাসনের শুরুর দিকে লর্ড ক্লাইভ বা ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো শাসকরা কলকাতার বড় বড় বাবুদের (যেমন নবকৃষ্ণ দেব) শারদীয়া পুজোয় অংশগ্রহণ করতেন। ইংরেজদের এই উৎসাহ এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে শরৎকালের পুজোর জৌলুস ও বাজেট ক্রমে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, চৈত্র মাসের আবহাওয়া অর্থাৎ গরম এবং ম্যালেরিয়া বা বসন্ত (Pox) রোগের ভয়ের কারণে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ সাহেবরা চৈত্র মাসের পুজো থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতেন। ফলে ধীরে ধীরে বাসন্তী পুজো বনেদি বাড়ির অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
৩. অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত: চৈত্র মাস বাঙালির ব্যবসার হালখাতা তৈরির সময়। ব্রিটিশ আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে চৈত্র মাসকে কেন্দ্র করে যে উৎসবগুলো হতো, বাসন্তী পুজো ছিল তার কেন্দ্রীয় শক্তি। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার বা মহাজনি প্রথার চাপে পিষ্ট বাঙালি এই সময় মা বাসন্তীর আরাধনার মাধ্যমে 'অশুভ শক্তির বিনাশ' কামনা করত, যা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলত।
(আরও পড়ুন: সর্ববুদ্ধডাকিনী নামে ডাকা হয় তাঁকে, কে এই দেবী বজ্রযোগিনী? কেন তাঁকে নিয়ে এত ভয় আর রহস্য)
আজকের বাসন্তী পুজো
বর্তমানে বাসন্তী পুজো মূলত শান্তিনিকেতন বা রামকৃষ্ণ মিশনের মতো জায়গায় অত্যন্ত শুদ্ধাচারে পালিত হয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জাঁকজমকপূর্ণ শরৎকালের পুজোর আগে আমাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত ছিল এই বসন্তের বন্দনা।
(আরও পড়ুন: মহাভারতের বীর চেকিতানের কথা অনেকেই ভুলে গিয়েছেন, অথচ তিনি না থাকলে পাণ্ডবদের যুদ্ধ জয় কঠিন হত)
বঙ্গদেশে বাসন্তী পুজোর ইতিহাস কেবল ভক্তির নয়, বরং লড়াই আর বিবর্তনের ইতিহাস। রাজা সুরথের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পুজো ব্রিটিশ আমলের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। এই পুজো আমাদের শেখায়, অকালবোধন হোক বা আদি বোধন—শক্তির বিনাশ নেই।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


