সনাতন ধর্মে একাদশিতে ভাত খেতে নিষেধ করা হয়েছে কেন? আসল কারণটা অনেকেই জানেন না
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি মাসে দুটি একাদশী তিথি আসে—একটি শুক্লপক্ষে এবং অন্যটি কৃষ্ণপক্ষে। একাদশী ব্রতর প্রধান ও আবশ্যিক নিয়ম হলো এই দিন চাল বা চালজাতীয় খাবার, বিশেষ করে ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ।
সনাতন ধর্মে একাদশী ব্রত পালন করা হয় পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণুর প্রীতিলাভের জন্য। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি মাসে দুটি একাদশী তিথি আসে—একটি শুক্লপক্ষে এবং অন্যটি কৃষ্ণপক্ষে। একাদশী ব্রতর প্রধান ও আবশ্যিক নিয়ম হলো এই দিন চাল বা চালজাতীয় খাবার, বিশেষ করে ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ। এর পেছনে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক এবং জ্যোতিষতাত্ত্বিক কারণ।

একাদশীতে ভাত নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এবং এই নিয়ে ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি জেনে নিন।
একাদশীতে ভাত কেন বর্জনীয়? পুরাণ ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, একবার এক পাপপুরুষ ব্রহ্মার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা তাকে একাদশী তিথিতে শস্যের মধ্যে অবস্থান করার নির্দেশ দেন। তাই বিশ্বাস করা হয়, একাদশীতে অন্ন বা ভাত গ্রহণ করলে ওই ব্যক্তির শরীরে সমস্ত পাপ প্রবেশ করে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, এই বিশেষ তিথিতে অন্ন গ্রহণের অর্থ হলো কলিযুগের অশুভ শক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে এর প্রকৃত কারণ লুকিয়ে আছে প্রকৃতি ও মানবশরীরের সূক্ষ্ম যোগসূত্র ও বিজ্ঞানের মধ্যে।
১. চন্দ্রের প্রভাব ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ
জ্যোতিষশাস্ত্রে চন্দ্র (Moon) হলো মনের কারক এবং মানবদেহের জলীয় অংশের নিয়ন্ত্রক। একাদশী তিথি আসে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার ঠিক চার দিন আগে। এই সময়ে চন্দ্রের আকর্ষণ শক্তি বা জোয়ার-ভাটার প্রভাব আমাদের শরীরে থাকা জলীয় উপাদানের ওপর প্রবল হয়ে ওঠে। ভাত বা চাল হলো এমন একটি শস্য যা প্রচুর পরিমাণে জল শোষণ করে। একাদশীতে ভাত খেলে শরীরে জলীয় অংশ বেড়ে যায়, যার ফলে মনের ওপর চন্দ্রের প্রভাব বাড়ে এবং মানুষ চঞ্চল, অলস বা কামাসক্ত হয়ে পড়তে পারে। আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য মনের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যা ভাত বর্জনের মাধ্যমে অর্জন করা সহজ হয়।
২. বৈজ্ঞানিক ও শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, মাসে দুবার উপবাস রাখা বা লঘু আহার গ্রহণ করা হজম প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত উপকারী। আমাদের অন্ত্র ও পাকস্থলীকে বিশ্রাম দেওয়ার এটি একটি চমৎকার উপায়। চালজাতীয় শস্য হজম হতে বেশি সময় ও শক্তির প্রয়োজন হয়। একাদশীতে ভাত না খেয়ে ফল বা নির্জলা উপবাস করলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ (Toxins) বেরিয়ে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, একাদশী তিথিতে মহাজাগতিক শক্তিগুলো বিশেষ বিন্যাসে থাকে। এই সময় আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে।
- গ্রহদোষ শান্তি: যাদের জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্রের অবস্থান দুর্বল বা যাদের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম, জ্যোতিষীরা তাদের কঠোরভাবে একাদশী পালনের পরামর্শ দেন। ভাত না খেয়ে ব্রত পালন করলে চন্দ্রের অশুভ প্রভাব কমে এবং মানসিক একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।
- শক্তির ভারসাম্য: জ্যোতিষশাস্ত্র বলে, অন্ন হলো পৃথিবী ও জলের মিশ্রণ। একাদশীর প্রবল মহাজাগতিক টানে শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে অন্ন বর্জন করা জরুরি, নতুবা হজমের সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সৃষ্টি হতে পারে।
একাদশীতে ভাত না খাওয়ার নিয়মটি কেবল কোনো অন্ধ সংস্কার নয়; বরং এটি শরীর ও মনকে প্রকৃতির ছন্দের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। এই ব্রত পালনের মাধ্যমে যেমন আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব, তেমনই শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক শান্তি লাভ করা যায়। তাই শুদ্ধ মনে এই তিথি পালন করা প্রতিটি সচেতন মানুষের জন্য মঙ্গলদায়ক।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


