আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি ধ্রুব সত্য হলো—মহাবিশ্বে আলোর চেয়ে দ্রুত কোনো কিছুই চলতে পারে না। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্যস্থানে আলোর গতিবেগ হলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। কিন্তু সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিজ্ঞানপ্রেমীদের মধ্যে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, অন্ধকার (Darkness) বা ছায়া আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে চলতে পারে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো এটি আইনস্টাইনের কোনো নিয়মই ভঙ্গ করে না!

বিজ্ঞানের জগতে আমরা জানি, আলোর গতিই সর্বোচ্চ। কিন্তু যদি বলা হয় 'অন্ধকার' আলোকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? প্রথম শুনলে এটি কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের এক চমৎকার কৌশল। বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, কীভাবে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্ধকার বা ছায়ার গতি আলোর বেগকে অতিক্রম করতে পারে এবং কেন এতে মহাবিশ্বের কোনো মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘিত হয় না।
অন্ধকার আসলে কী?
পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় অন্ধকার কোনো 'বস্তু' বা 'শক্তি' নয়। এটি কেবল আলোর অনুপস্থিতি। যখন কোনো বস্তু আলোর উৎসকে বাধা দেয়, তখন সেই বস্তুর পেছনে ছায়া তৈরি হয়। যেহেতু অন্ধকার কোনো কণা (যেমন ফোটন) বা তথ্য বহনকারী তরঙ্গ নয়, তাই এর গতির ওপর পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত গতির সীমা বা 'স্পিড লিমিট' কার্যকর হয় না।
(আরও পড়ুন: শত শত কিলোমিটার দৈত্যাকার হাতিদের তাড়া করে শিকার করত এই আদিম মানব! তাদের বুদ্ধির দৌড় অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের)
কীভাবে অন্ধকার আলোর চেয়ে দ্রুত চলে?
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: শত শত কিলোমিটার দৈত্যাকার হাতিদের তাড়া করে শিকার করত এই আদিম মানব! তাদের বুদ্ধির দৌড় অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের)
কীভাবে অন্ধকার আলোর চেয়ে দ্রুত চলে?
{{/usCountry}}একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে এটি বোঝা সম্ভব। মনে করুন, আপনি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার লাইট চাঁদের দিকে তাক করে আছেন। এখন আপনি যদি আপনার হাতের আঙুল খুব দ্রুত লেজারের সামনে দিয়ে সরিয়ে নেন, তবে চাঁদের বুকে তৈরি হওয়া সেই আঙুলের ছায়াটি এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সরে যাবে।
যদি লেজারটি যথেষ্ট শক্তিশালী হয় এবং আপনার হাতের নড়াচড়া যথেষ্ট দ্রুত হয়, তবে চাঁদের ওপর সেই ছায়ার সরে যাওয়ার গতি আলোর গতিবেগকে (২৯৯,৭৯২ কিমি/সেকেন্ড) ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু কেন? কারণ এখানে কোনো 'বস্তু' বা 'তথ্য' এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করছে না। এটি কেবল আলোর অনুপস্থিতির একটি জ্যামিতিক প্রতিফলন মাত্র।
(আরও পড়ুন: সল্ট লেকের গভীরে মিলল বিশাল পানীয় জলের আধার, নোনা জলের নিচে মিষ্টির হদিশ! প্রকৃতির খেলায় হতবাক বিজ্ঞানীরা)
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কি অক্ষুণ্ণ থাকছে?
আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুযায়ী, কোনো তথ্য (Information) বা ভরসম্পন্ন বস্তু (Mass) আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। ছায়া যেহেতু কোনো তথ্য বহন করে না এবং এর কোনো ভর নেই, তাই এটি আলোর চেয়ে দ্রুত চললেও মহাবিশ্বের কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয় না। ছায়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোনো সংকেত পাঠানো সম্ভব নয়, তাই এটি পদার্থবিজ্ঞানের গতির সীমার বাইরে থাকে।
এই ধারণার গুরুত্ব কী?
এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটি মহাকাশ বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাবিশ্বের বিশাল দূরত্বে যখন কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু (যেমন ব্ল্যাক হোল বা গ্যালাক্সি) অন্য কোনো আলোর উৎসকে আড়াল করে, তখন সেই ছায়ার সরণ আমাদের ভ্রম তৈরি করতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য এটি বোঝা জরুরি যে, দৃশ্যমান গতির সবটাই বাস্তব স্থানান্তর নয়। এই 'সুপারলুমিনাল' বা আলোর চেয়ে দ্রুত গতির বিভ্রম মহাবিশ্বের জ্যামিতিক গঠন বুঝতে সাহায্য করে।
অন্ধকারের এই অতি-দ্রুত গতি আসলে একটি দৃষ্টিভঙ্গির খেলা। আলো আমাদের মহাবিশ্বের গতির সীমা নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোর অনুপস্থিতি বা ছায়া গতির সব শিকল ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাবিশ্ব যতটা সরল মনে হয়, তার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও অনেক জটিল ও রোমাঞ্চকর সমীকরণ।