মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, অদূর ভবিষ্যতে মানুষ ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে—এমনই এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘায়ু হওয়ার এই রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে সমুদ্রের বিশালকায় প্রাণী তিমির ডিএনএ-তে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে তিমির জেনোম বিশ্লেষণ করে মানুষের বার্ধক্য থামানোর উপায় খুঁজছেন।

বিবর্তন বিজ্ঞানের ইতিহাসে দীর্ঘায়ু হওয়া নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। সাধারণত দেখা যায়, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে যাদের শরীরের আকার বড়, তাদের আয়ুও বেশি হয়। তবে তিমির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিস্ময়কর। বিশেষ করে 'বো-হেড' (Bowhead Whale) প্রজাতির তিমি ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তিমির এই বিশেষ ক্ষমতা যদি মানুষের জিনতত্ত্বে প্রয়োগ করা যায়, তবে মানুষের আয়ুও বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ করা সম্ভব।
(আরও পড়ুন: ডাইনোসরের আগে থেকে পৃথিবীতে আছে এই মাছগুলি! এর মধ্যে একটি তো সকলেরই চেনা)
তিমির দীর্ঘায়ুর নেপথ্যে কী কাজ করে?
গবেষকদের মতে, তিমির শরীরে এমন কিছু বিশেষ জিন রয়েছে যা কোষের মেরামত (Cell Repair) করতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম। সাধারণত দীর্ঘ জীবনে কোষের বিভাজনের সময় ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা থেকে ক্যান্সার বা বার্ধক্যজনিত রোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু তিমির শরীরে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর গতির। তাদের জেনোম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা অতি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করতে পারে।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল
মানুষের শরীরে যত বেশি কোষ থাকে, ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি তত বেশি থাকে। সেই হিসেবে তিমির মতো দানবীয় প্রাণীর অনেক আগেই ক্যান্সারে মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। এই রহস্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘পেটো’স প্যারাডক্স’ (Peto’s Paradox) বলা হয়। তিমির শরীরে থাকা বিশেষ অ্যান্টি-ক্যান্সার জিনগুলো টিউমার বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। বিজ্ঞানীরা যদি এই জিনোম সিকোয়েন্স মানুষের জন্য কার্যকর কোনো থেরাপিতে রূপান্তর করতে পারেন, তবে অকাল মৃত্যু ঠেকানো অনেক সহজ হবে।
{{/usCountry}}মানুষের শরীরে যত বেশি কোষ থাকে, ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি তত বেশি থাকে। সেই হিসেবে তিমির মতো দানবীয় প্রাণীর অনেক আগেই ক্যান্সারে মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। এই রহস্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘পেটো’স প্যারাডক্স’ (Peto’s Paradox) বলা হয়। তিমির শরীরে থাকা বিশেষ অ্যান্টি-ক্যান্সার জিনগুলো টিউমার বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। বিজ্ঞানীরা যদি এই জিনোম সিকোয়েন্স মানুষের জন্য কার্যকর কোনো থেরাপিতে রূপান্তর করতে পারেন, তবে অকাল মৃত্যু ঠেকানো অনেক সহজ হবে।
{{/usCountry}}২০০ বছর বাঁচার সম্ভাবনা কতটা বাস্তব?
ইউনিভার্সিটি অফ লিভারপুলের বিজ্ঞানীরা প্রথমবার এই বো-হেড তিমির জেনোম ম্যাপ তৈরি করেছেন। তাঁদের মতে, মানুষের আয়ু বাড়ানোর জন্য কেবল ওষুধ নয়, বরং জেনেটিক এডিটিং বা জিন থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। তিমির দীর্ঘায়ুর জন্য দায়ী জিনগুলো শনাক্ত করে যদি মানুষের কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করা যায়, তবে ২০০ বছর পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব নয়। এটি কেবল দীর্ঘ জীবন নয়, বরং বৃদ্ধ বয়সেও কর্মক্ষম থাকা এবং রোগমুক্ত জীবন যাপনের এক নতুন দিশা দেখাবে।
(আরও পড়ুন: মানুষের মূত্রের স্ক্রিস্টাল থেকে ৪৮ কোটি তামার সূচ, মহাকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে এসব! শুনলে চমকে যাবেন)
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রভাব
এই গবেষণা সফল হলে আলঝেইমার, পারকিনসন বা হৃদরোগের মতো বার্ধক্যজনিত সমস্যাগুলো ইতিহাসের পাতায় চলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীর ওপর তিমির এই বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করছেন। যদিও মানুষের ওপর এর প্রয়োগ নিয়ে নৈতিক ও প্রযুক্তিগত অনেক বিতর্ক রয়েছে, তবুও তিমির এই জৈবিক কৌশল আগামী দিনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
(আরও পড়ুন: এই সময়ের সবচেয়ে রহস্যময় শিল্পী, অবশেষে খসে গেল মুখোশ! আড়ালের মুখটা দেখে হতবাক দুনিয়া)
প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের অবাক করে দেয়। গভীর সমুদ্রের নীল তিমির জেনোমে যে মানুষের অমরত্বের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কয়েক দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়। হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই এমন দিন আসবে যখন মানুষের কাছে শতবর্ষ পার করা হবে এক অতি সাধারণ ঘটনা।