মানুষের মুখমণ্ডলের একটি অতি সাধারণ অংশ হলো চিবুক বা থুতনি (Chin)। আয়নায় তাকালে আমরা একে রোজই দেখি, কিন্তু আপনি কি জানেন যে পৃথিবীতে কেবল মানুষেরই চিবুক আছে? শিম্পাঞ্জি, গোরিলা বা আমাদের আদিম পূর্বপুরুষ নিয়ানডার্থালদেরও কোনো সুগঠিত চিবুক ছিল না। বিবর্তনের কোন বাঁকে এবং কেন কেবল আমাদেরই এই বিশেষ অঙ্গটি তৈরি হলো, জানলে অবাক হবেন।

মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের পেছনে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু চিবুক বা থুতনি এমন একটি অঙ্গ, যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে তর্কে লিপ্ত। মজার বিষয় হলো, আমাদের সবথেকে কাছের আত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের চোয়াল অনেকটা ঢালু এবং পেছনের দিকে সরে যাওয়া, তাদের কোনো হাড়ের অভিক্ষেপ বা চিবুক নেই। তাহলে হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের মুখমণ্ডলে এই হাড়ের বাড়তি অংশটি এল কোথা থেকে?
চিবুক নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
দীর্ঘদিন ধরে চিবুকের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা তিনটি প্রধান তত্ত্ব দিয়েছিলেন, যা সাম্প্রতিক গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে:
১. চর্বণের সুবিধা: অনেকে মনে করতেন শক্ত খাবার চিবানোর সময় চোয়ালকে বাড়তি শক্তি দিতে চিবুক তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, চিবুক চিবানোর সময় হাড়ের ওপর কোনো বিশেষ চাপ কমাতে সাহায্য করে না।
{{/usCountry}}১. চর্বণের সুবিধা: অনেকে মনে করতেন শক্ত খাবার চিবানোর সময় চোয়ালকে বাড়তি শক্তি দিতে চিবুক তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, চিবুক চিবানোর সময় হাড়ের ওপর কোনো বিশেষ চাপ কমাতে সাহায্য করে না।
{{/usCountry}}২. কথা বলার জন্য: ধারণা করা হতো কথা বলার সময় জিভ ও মুখের পেশির নড়াচড়াকে ধরে রাখতে চিবুক প্রয়োজন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, কথা বলার সময় চিবুকের হাড়ের ওপর কোনো যান্ত্রিক চাপ পড়ে না।
৩. আকর্ষণ বৃদ্ধি: অনেকে মনে করতেন এটি কেবল যৌন আকর্ষণের জন্য (Sexual Selection) তৈরি হয়েছে। কিন্তু চিবুক নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে উপস্থিত, যা এই তত্ত্বকে দুর্বল করে দেয়।
(আরও পড়ুন: ডাইনোসরের আগে থেকে পৃথিবীতে আছে এই মাছগুলি! এর মধ্যে একটি তো সকলেরই চেনা)
বিবর্তনের ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ বা স্প্যান্ড্রেল (Spandrel)
আইওয়া ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানীদের মতে, চিবুক আসলে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়নি। বরং এটি মানুষের মুখমণ্ডলের বিবর্তনের একটি ‘বাই-প্রোডাক্ট’ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের চোয়াল ছিল বিশাল। সময়ের সাথে সাথে যখন মানুষ রান্না করা নরম খাবার খেতে শুরু করল, তখন তাদের দাঁত এবং চোয়ালের আকার ছোট হতে শুরু করল।
আমাদের মুখমণ্ডল বা ফেস প্রোফাইল ছোট হয়ে ভেতরের দিকে ঢুকে গেলেও, নিচের চোয়ালের হাড়ের সামনের অংশটি সেই তুলনায় দ্রুত ছোট হয়নি। ফলে পেছনের অংশ সংকুচিত হলেও সামনের হাড়টি বাড়তি অংশ হিসেবে বাইরের দিকে রয়ে গেল। একেই আমরা আজ চিবুক বা থুতনি বলি। অর্থাৎ, চিবুক আসলে কোনো বাড়তি হাড় নয়, বরং এটি চোয়ালের বাকি অংশ ছোট হয়ে যাওয়ার ফলে থেকে যাওয়া একটি চিহ্ন।
(আরও পড়ুন: মানুষের মূত্রের স্ক্রিস্টাল থেকে ৪৮ কোটি তামার সূচ, মহাকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে এসব! শুনলে চমকে যাবেন)
সামাজিক বিবর্তন ও হরমোনের প্রভাব
আরেকটি আধুনিক তত্ত্ব বলছে, মানুষের সামাজিক ব্যবহারের পরিবর্তনের ফলেও চিবুকের গঠন প্রভাবিত হয়েছে। আদিম মানুষের মধ্যে হিংস্রতা বেশি ছিল, যা উচ্চ টেস্টোস্টেরন হরমোনের সাথে যুক্ত। এই হরমোন ভ্রূণ অবস্থায় চওড়া চোয়াল তৈরি করে। মানুষ যখন আরও শান্ত ও সামাজিক হতে শুরু করল, তখন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন এল এবং মুখমণ্ডল সংকুচিত হলো। এই ‘শান্ত’ মুখমণ্ডলেরই অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্পষ্ট চিবুক।
(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
মানুষের চিবুক বিবর্তনের এক অনন্য ধাঁধা। এটি প্রমাণ করে যে বিবর্তনের প্রতিটি পরিবর্তন সবসময় কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য হয় না; কখনও কখনও তা কেবল শারীরিক কাঠামোর পরিবর্তনের একটি অবশিষ্টাংশ মাত্র। চিবুক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে কতটা আলাদা এবং আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও সমাজ কীভাবে আমাদের হাড়ের গঠন পর্যন্ত বদলে দিয়েছে।