গাড়িতে উঠলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বাসে যাতায়াতের সময় শরীর খারাপ হওয়া—আমাদের অনেকের কাছেই এটি একটি অতি পরিচিত সমস্যা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মোশন সিকনেস (Motion Sickness)। কেন আমাদের শরীর চলন্ত অবস্থায় এমন অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা বিবর্তনের রহস্য কী।

ছুটির দিনে দূরে কোথাও ভ্রমণে বেরিয়েছেন, কিন্তু গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো অস্বস্তি। মাথা ঘোরা, ঘাম হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বমি। এই সমস্যাটি কেবল আপনার একার নয়, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মোশন সিকনেসের শিকার। কিন্তু কেন সুস্থ শরীরে হঠাৎ এমন অসুস্থতা দেখা দেয়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর কারণ আপনার চোখ এবং কানের মাঝখানের এক মারাত্মক ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা’।
(আরও পড়ুন: মন থেকে হিংসা দূর হতেই তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গ, এখন কোনও কাজেই লাগে না! যদিও মাথা খাটাতে গেলেই হাত যায় এখানে, বলছে গবেষণা)
সংবেদনশীল গোলযোগ: চোখ বনাম কান
আমাদের শরীর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মূলত তিনটি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে—চোখ, অন্তকর্ণ (Inner Ear) এবং পেশির স্নায়ু। যখন আমরা স্থির থাকি, তখন এই তিনটি মাধ্যমই মস্তিষ্ককে একই তথ্য পাঠায়। কিন্তু চলন্ত গাড়িতে বা নৌকায় বসে থাকাকালীন সমস্যাটি শুরু হয়।
আপনার অন্তকর্ণে থাকা তরল পদার্থ টের পায় যে আপনি গতিশীল আছেন। কিন্তু আপনি যদি গাড়ির ভেতরে স্থির হয়ে বসে থাকেন বা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে আপনার চোখ মস্তিষ্ককে বার্তা পাঠায় যে আপনি স্থির আছেন। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য বা 'সেন্সরি কনফ্লিক্ট' (Sensory Conflict) মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে তোলে।
{{/usCountry}}আপনার অন্তকর্ণে থাকা তরল পদার্থ টের পায় যে আপনি গতিশীল আছেন। কিন্তু আপনি যদি গাড়ির ভেতরে স্থির হয়ে বসে থাকেন বা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে আপনার চোখ মস্তিষ্ককে বার্তা পাঠায় যে আপনি স্থির আছেন। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য বা 'সেন্সরি কনফ্লিক্ট' (Sensory Conflict) মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে তোলে।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: ২০০ বছরের বেশি হয়ে যেতে পারে মানুষের আয়ু, তিমি মাছের থেকে সামান্য সাহায্য দরকার! বলছে গবেষণা)
বিষক্রিয়ার ভুল ধারণা ও বমি
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, মস্তিষ্ক যখন এই গরমিল বার্তা পায়, তখন সে মনে করে আপনার শরীরে কোনো বিষক্রিয়া (Neurotoxin) ঘটেছে। বিবর্তনের ইতিহাসে আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন কোনো বিষাক্ত খাবার খেতেন, তখন তাঁদের স্নায়ুতন্ত্র একইভাবে বিভ্রান্ত হতো। তাই আজও যখন গাড়ি বা জাহাজের দোলাচল মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে, তখন সে আত্মরক্ষার তাগিদে শরীরকে ‘বিষ’ বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর ফলেই আমাদের বমি বমি ভাব হয় বা বমি হয়ে যায়।
(আরও পড়ুন: মানুষের মূত্রের স্ক্রিস্টাল থেকে ৪৮ কোটি তামার সূচ, মহাকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে এসব! শুনলে চমকে যাবেন)
কেন সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় না?
মোশন সিকনেসের তীব্রতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা সবথেকে বেশি দেখা যায় (সাধারণত ২ থেকে ১২ বছর)। আবার মহিলাদের মধ্যে পুরুষদের তুলনায় মোশন সিকনেস বেশি হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এর পেছনে হরমোন বা জেনেটিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে মজার বিষয় হলো, যারা গাড়ি চালায় অর্থাৎ চালকদের মোশন সিকনেস হয় না। কারণ, চালকের মস্তিষ্ক আগে থেকেই জানে গাড়ি কখন কোন দিকে ঘুরবে, ফলে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলো বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ পায় না।
(আরও পড়ুন: ডাইনোসরের আগে থেকে পৃথিবীতে আছে এই মাছগুলি! এর মধ্যে একটি তো সকলেরই চেনা)
মোশন সিকনেস থেকে বাঁচার উপায়
বিজ্ঞানীরা এই অস্বস্তি এড়াতে কয়েকটি সহজ টিপস দিয়েছেন:
১. দিগন্তের দিকে তাকান: গাড়িতে জানালার বাইরে দূরের কোনো স্থির বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ও কান একই গতি অনুভব করতে পারে।
২. ফোন বা বই এড়িয়ে চলুন: চলন্ত অবস্থায় পড়ার চেষ্টা করলে চোখ মনে করে আপনি স্থির, যা বিভ্রান্তি বাড়ায়।
৩. বাতাস চলাচল: সতেজ বাতাস বা এসি চালিয়ে রাখলে অস্বস্তি কিছুটা কমে।
৪. আদা বা মিন্ট: প্রাকৃতিক উপায়ে বমি ভাব কমাতে আদা বা পুদিনা বেশ কার্যকর।
মোশন সিকনেস আসলে কোনো রোগ নয়, বরং এটি আপনার শরীরের একটি অতি-সক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের মস্তিষ্ক এখনও আধুনিক দ্রুতগামী যানবাহনের সাথে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। তবে বিজ্ঞানের এই ব্যাখ্যা জানলে আপনি অন্তত এইটুকু নিশ্চিত হতে পারেন যে, আপনার শরীর কেবল আপনাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে—যদিও সেই পদ্ধতিটি বেশ অস্বস্তিকর।