একসময় ভোটের ময়দানে একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন দুই টলিউড তারকা দেব ও হিরণ। নির্বাচনের আবহে তাঁদের বাকযুদ্ধ বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে শুরু করে রাজ্য রাজনীতির নানা ইস্যুতে সাংসদ দেব এবং বিজেপি বিধায়ক হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়ের সংঘাত ছিল বহুল চর্চিত।

তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে পাশে সরিয়ে এবার টলিউডের স্বার্থে একই মঞ্চে দেখা যেতে চলেছে তাঁদের। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অস্থিরতা দূর করতে বড়সড় উদ্যোগ নিয়েছে নবান্ন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই গঠিত হতে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা কমিটিতে স্থান পেয়েছেন দেব ও হিরণ— সঙ্গে রয়েছেন টলিউডের আরও একঝাঁক প্রথম সারির তারকা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
৮ জুনের বৈঠকের নথিতে মিলল বড় ইঙ্গিত
গত ৮ জুন নবান্নে অনুষ্ঠিত হয় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর এবং চলচ্চিত্র জগতের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী (Minutes of Meeting)। সেখানে টলিউডের বর্তমান সংকট, প্রশাসনিক কাঠামো এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবের উল্লেখ রয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় এবং পাপিয়া অধিকারী। প্রশাসনের তরফে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডাঃ সুব্রত গুপ্ত, চলচ্চিত্র অধিকর্তা এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা।
তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরে আসতে পারে বড় রদবদল
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে থাকা প্রায় ৪০টি কমিটি ও সংস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা হবে। যেসব সংস্থা একই ধরনের কাজ করছে, সেগুলিকে একত্রিত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের প্রতিনিধিদের। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সভাপতি বা চেয়ারম্যান পদে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নামও তাঁরা সুপারিশ করতে পারবেন।
হল বুকিংয়ে আসছে নতুন ব্যবস্থা
{{/usCountry}}কার্যবিবরণী অনুযায়ী, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে থাকা প্রায় ৪০টি কমিটি ও সংস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা হবে। যেসব সংস্থা একই ধরনের কাজ করছে, সেগুলিকে একত্রিত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের প্রতিনিধিদের। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সভাপতি বা চেয়ারম্যান পদে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নামও তাঁরা সুপারিশ করতে পারবেন।
হল বুকিংয়ে আসছে নতুন ব্যবস্থা
{{/usCountry}}সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে সরকারি অডিটোরিয়াম ও সাংস্কৃতিক হল বরাদ্দের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব করা হয়েছে একটি অভিন্ন আবেদন পদ্ধতি চালুর, যার মাধ্যমে সমস্ত হল বুকিংয়ের আবেদন এক জায়গা থেকে করা যাবে। এর ফলে প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
একইসঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বার্ষিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচিগুলোকেও নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ফেডারেশন ও গিল্ড নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা
বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল টলিপাড়ার বিভিন্ন ফেডারেশন ও গিল্ডের ভূমিকা। কার্যবিবরণীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান পরিচালন ব্যবস্থায় দ্রুত পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা না গেলে গোটা চলচ্চিত্র শিল্প বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে স্টুডিওপাড়ার হাজার হাজার টেকনিশিয়ান, কর্মী ও কলাকুশলীর জীবিকা ও কর্মসংস্থানের ওপর।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফেডারেশন ও গিল্ডগুলি ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনের আওতায় নিবন্ধিত সংস্থা। ফলে ভবিষ্যতের যে কোনও পরিবর্তন আইনসম্মত এবং নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনেই করতে হবে। নতুন নির্বাহী কমিটি গঠনের আগে পর্যন্ত বর্তমান কাঠামোই বহাল থাকবে।
এছাড়াও ফেডারেশনগুলির আইনি অবস্থান স্পষ্ট করতে ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
গড়ে উঠছে শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটি
টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটি গঠনের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। এই কমিটিতে থাকছেন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, প্রযোজনা এবং প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
প্রস্তাবিত সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন:
রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (বিধায়ক), পাপিয়া অধিকারী (বিধায়ক), রুদ্রনীল ঘোষ (বিধায়ক), হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় (বিধায়ক), প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (অভিনেতা), দীপক অধিকারী তথা দেব (সাংসদ), যিশু সেনগুপ্ত (অভিনেতা), মহেন্দ্র সোনি (প্রযোজক), সানি ঘোষ রায় (পরিচালক ও প্রযোজক), জয়ন্ত কুণ্ডু (প্রবীণ প্রোডাকশন ম্যানেজার), কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় (পরিচালক), সৃজিত মুখোপাধ্যায় (পরিচালক), অমিত দাস (টিভি পরিচালক), তন্ময় দে (অভিনেতা), ড. সৌমিত্র মোহন (সচিব, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর), কৃত্তিবাস নায়ক (চলচ্চিত্র অধিকর্তা), শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায় (সিইও, নন্দন), সান্তনু বসু (অতিরিক্ত সচিব, মুখ্যমন্ত্রীর দফতর)। এছাড়াও উপস্থিত বিধায়কদের সুপারিশ অনুযায়ী আরও সদস্যকে এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
টলিউডের সংকট কাটানোর পথে বড় পদক্ষেপ?
শিল্প মহলের একাংশের মতে, গত কয়েক মাস ধরে টলিপাড়ায় যে অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করার ক্ষেত্রে এই বৈঠক এবং প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এখন নজর থাকবে নবান্নের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ এই নতুন কমিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং টলিউডের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান কত দ্রুত করতে পারে, তার উপরই নির্ভর করছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের আগামী দিনের পথচলা।