Uvula role in human speech: আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ বড় করে হাঁ করলেই গলার শেষ প্রান্তে একটি ছোট মাংসপিণ্ড ঝুলতে দেখা যায়। সাধারণ বাংলায় আমরা একে ‘আলজিভ’ বলি, আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘উভিউলা’ (Uvula)। প্রতিদিন আয়নায় দেখলেও আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমাদের শরীরে এই ছোট্ট অঙ্গটির আসল কাজ কী? কেনই বা বিবর্তনের ধারায় মানুষের শরীরে এটি টিকে রইল?

হালে একজন বিবর্তনবিদ (Evolutionary Biologist) মানুষের শরীরের এই রহস্যময় অঙ্গটির কার্যকারিতা এবং এর পেছনের বিবর্তনগত ইতিহাস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। উভিউলা কেন মানুষের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ, তা জেনে নিন।
অনেকদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল আলজিভ হয়তো একটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (Vestigial Organ), যার বিশেষ কোনো কাজ নেই। কিন্তু আধুনিক বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, উভিউলা মানুষের বেঁচে থাকা এবং যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কাজ সম্পন্ন করে।
১. খাবারকে ভুল পথে যাওয়া থেকে আটকানো (Preventing Nasal Regurgitation)
উভিউলার সবচেয়ে প্রাথমিক এবং যান্ত্রিক কাজ হলো খাবার ও জল গিলে খাওয়ার সময় সাহায্য করা। আমরা যখন কোনো খাবার চিবিয়ে গিলে ফেলি, তখন উভিউলা এবং আমাদের নরম তালু (Soft Palate) স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরের দিকে উঠে যায়। এটি নাসাপথ বা নাকের পেছনের অংশটিকে (Nasopharynx) পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আমরা যখন খাবার বা তরল কিছু গিলি, তা কোনোভাবেই নাকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না, সরাসরি খাদ্যনালীতে চলে যায়।
২. কথা বলার সময় গলার আর্দ্রতা রক্ষা করা (Lubrication and Saliva)
উভিউলা বা আলজিভের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে ‘সেরোমিউকোস গ্ল্যান্ড’ (Seromucous Glands) বা লালা গ্রন্থি থাকে। এই গ্রন্থিগুলো খুব দ্রুত এবং অনবরত পাতলা লালা ক্ষরণ করতে পারে। আমরা যখন অনর্গল কথা বলি, তখন আমাদের শ্বাসনালী ও গলা শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উভিউলা অবিরত লালা সরবরাহ করে পুরো গলা এবং মুখের পেছনের অংশকে সিক্ত ও আর্দ্র রাখে। এটি পিচ্ছিলকারক বা লুব্রিক্যান্ট হিসেবে কাজ করে, যার ফলে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেও আমাদের গলার ভেতরের টিস্যুগুলো ঘর্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
৩. মানুষের অনন্য ভাষা ও স্বর তৈরিতে (Role in Speech)
{{/usCountry}}উভিউলা বা আলজিভের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে ‘সেরোমিউকোস গ্ল্যান্ড’ (Seromucous Glands) বা লালা গ্রন্থি থাকে। এই গ্রন্থিগুলো খুব দ্রুত এবং অনবরত পাতলা লালা ক্ষরণ করতে পারে। আমরা যখন অনর্গল কথা বলি, তখন আমাদের শ্বাসনালী ও গলা শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উভিউলা অবিরত লালা সরবরাহ করে পুরো গলা এবং মুখের পেছনের অংশকে সিক্ত ও আর্দ্র রাখে। এটি পিচ্ছিলকারক বা লুব্রিক্যান্ট হিসেবে কাজ করে, যার ফলে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেও আমাদের গলার ভেতরের টিস্যুগুলো ঘর্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
৩. মানুষের অনন্য ভাষা ও স্বর তৈরিতে (Role in Speech)
{{/usCountry}}মানুষের জটিল ও উন্নত ভাষা ব্যবহারের পেছনেও উভিউলার এক মস্ত বড় ভূমিকা রয়েছে। পৃথিবীর বেশ কিছু ভাষায় (যেমন— ফরাসি, জার্মান, আরবি এবং হিব্রু) এমন কিছু বর্ণ বা শব্দ রয়েছে, যা উচ্চারণ করতে গলার পেছনের এই আলজিভের কম্পন বা মুভমেন্টের প্রয়োজন হয়। এগুলোকে ভাষাবিজ্ঞানে ‘উভিউলার কনসোনেন্টস’ (Uvular Consonants) বলা হয়। মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে যখন ভাষা ও কণ্ঠস্বরের বিকাশ ঘটছিল, তখন এই অঙ্গটি শব্দকে মডিউলেট বা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করেছিল।
৪. বিবর্তনের ধারায় মানুষের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানীদের মতে, পুরো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (Mammals) জগৎ ঘাঁটলে দেখা যাবে, একমাত্র মানুষ এবং কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাইমেটদের (যেমন শিম্পাঞ্জি বা গরিলা, তবে তাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারে) ছাড়া আর কোনো প্রাণীর শরীরে এমন উন্নত ও ঝুলন্ত উভিউলা বা আলজিভ দেখা যায় না।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষ যখন চার পায়ে হাঁটা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শুরু করে (Bipedalism), তখন মানুষের মাথার খুলি, শ্বাসনালী এবং মুখের ভেতরের কাঠামোগত অবস্থানে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ফলে আমাদের মুখ ও গলার ভেতরের যে ফাঁকা অংশ তৈরি হয়, সেখানে খাবার ও বাতাসের যাতায়াত সুনির্দিষ্ট করতে এবং উন্নত ভাষায় কথা বলার জৈবিক চাহিদা মেটাতেই বিবর্তনের নিয়মে মানুষের শরীরে এই অনন্য উভিউলার সৃষ্টি হয়েছে।
মানুষের শরীরের কোনো সৃষ্টিই বৃথা নয়। মুখের ভেতরে ঝুলতে থাকা এই ছোট্ট মাংসপিণ্ডটি প্রমাণ করে যে, মানবদেহের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের এক একটি নিখুঁত মাস্টারপিস। এটি আমাদের খাবার গিলতে যেমন সাহায্য করছে, তেমনই মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম অর্থাৎ কথা বলার ক্ষমতাকেও সচল রাখছে।