হিমালয়ের শান্ত শীতল পাহাড়ের আড়ালে যেমন লুকিয়ে আছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য, তেমনই এর লোককথায় মিশে আছে গা ছমছমে সব রহস্য। উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন হিমালয়ের লোকগাঁথায় এমনই এক রহস্যময় এবং করুণ সত্তা হলো 'আছেরি' (Acheri)। কুমায়ুনি সংস্কৃতিতে আছেরি কেবল একটি ভূত নয়, বরং পাহাড়ের নির্জনতায় ঘুরে বেড়ানো এক অভিশপ্ত ছায়া।

(আরও পড়ুন: কালসর্প দোষ আসলে কী? সত্যিই কি বিষয়টা ভয়ের? নাকি যা বলা হয়, বাড়িয়ে বলা হয়)
কুমায়ুন অঞ্চলের পাহাড়ে যখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন গ্রামের মুরুব্বিরা ছোট মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেন। বিশেষ করে তাদের পরনে যদি লাল রঙের কোনো পোশাক থাকে, তবে তো কথাই নেই। এর কারণ হলো 'আছেরি'। কুমায়ুনি লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, আছেরি হলো পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী এমন এক অশরীরী আত্মা, যার নজর পড়লে শিশুদের প্রাণসংশয় হতে পারে।
আছেরি-র উৎপত্তির করুণ ইতিহাস
আছেরি-র উৎপত্তির মূলে রয়েছে এক গভীর বিষাদময় ইতিহাস। লোককথা অনুযায়ী, আছেরি হলো সেইসব অল্পবয়সী মেয়েদের আত্মা, যারা খুব অল্প বয়সে অযত্নে, অবহেলায় বা কোনো কঠিন রোগে ভুগে পাহাড়ে মারা গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়, যেসব কন্যাসন্তানরা পাহাড়ে হারিয়ে গিয়ে ঠান্ডায় বা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, তারাই আছেরি হয়ে পাহাড়ের গায়ে ঘুরে বেড়ায়।
যেহেতু তারা শৈশবে জীবনের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি এবং তাদের অকাল মৃত্যু হয়েছে, তাই তাদের আত্মা অতৃপ্ত থেকে যায়। এই অতৃপ্তির কারণেই তারা পাহাড়ের জনপদে নেমে আসে এমন শিশুদের খোঁজে, যাদের জীবন আনন্দময়। তারা মূলত ছোট মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের নিজেদের 'খেলার সাথী' হিসেবে পরলোকে নিয়ে যেতে চায়।
{{/usCountry}}যেহেতু তারা শৈশবে জীবনের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি এবং তাদের অকাল মৃত্যু হয়েছে, তাই তাদের আত্মা অতৃপ্ত থেকে যায়। এই অতৃপ্তির কারণেই তারা পাহাড়ের জনপদে নেমে আসে এমন শিশুদের খোঁজে, যাদের জীবন আনন্দময়। তারা মূলত ছোট মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের নিজেদের 'খেলার সাথী' হিসেবে পরলোকে নিয়ে যেতে চায়।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: মিজোরামের মারাল্যান্ডে লুকিয়ে আছে এক রহস্য়ময় প্রেতাত্মার কাহিনি! সেই আহমাও-এর গল্প শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে)
আছেরি-র রূপ ও স্বভাব
কুমায়ুনি বর্ণনা অনুযায়ী, আছেরি দেখতে খুব ছোট এবং সুন্দরী একটি মেয়ের মতো। তার পরনে থাকে পাহাড়ি পোশাক। তবে তার শরীরটি ছায়ার মতো স্বচ্ছ। তারা সাধারণত পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে বা নির্জন ঝর্ণার আশেপাশে বসবাস করে। রাতের বেলা পাহাড়ের ঢালু পথে তাদের হাসির শব্দ বা ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা যায় বলে অনেকে দাবি করেন। তারা একা থাকে না, প্রায়শই দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ায়।
লাল রঙের সাথে আছেরি-র সম্পর্ক
আছেরি নিয়ে সবথেকে পরিচিত বিশ্বাস হলো লাল রঙের প্রতি তাদের তীব্র আকর্ষণ। মনে করা হয়, লাল রঙ আছেরি-র অত্যন্ত প্রিয়। কোনো শিশু যদি লাল পোশাক পরে পাহাড়ের নির্জন পথে হাঁটে, তবে আছেরি তাকে দেখে প্রলুব্ধ হয়। আছেরি-র নজর লাগলে সেই শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তীব্র জ্বর আসে এবং অনেক সময় মারাও যায়। এই অবস্থাকে স্থানীয় ভাষায় 'আছেরি কি নজর' বলা হয়।
(আরও পড়ুন: মৃত শিকারিদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় এই পাহাড়ে! জানেন কি আইরি ভূতের কাহিনি? পড়ে নিন গা ছমছমে গল্প)
আছেরি থেকে বাঁচার উপায়
কুমায়ুনের পাহাড়ি জনপদে আছেরি-র হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে বেশ কিছু প্রাচীন প্রথা আজও মানা হয়:
১. লাল পোশাক বর্জন: ছোট মেয়েদের বিকেলের পর লাল পোশাক পরা নিষিদ্ধ।
২. লোহার কবজ: শিশুদের গলায় বা হাতে লোহার আংটি বা কবজ পরিয়ে রাখা হয়, কারণ মনে করা হয় অশুভ আত্মারা লোহাকে ভয় পায়।
৩. কালো টিপ: শিশুদের কপালে বা কানের পিছনে কালো কাজলের টিপ দেওয়া হয় যাতে আছেরি-র নজর না লাগে।
৪. রঙিন সুতো: অনেক সময় শিশুদের হাতে লাল বা কালো সুতো বেঁধে দেওয়া হয় রক্ষাকবচ হিসেবে।
(আরও পড়ুন: একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর এবং করুণ ভূত ‘আভি’! তার ইতিহাস ও লোককথা শুনলে চমকে যাবেন)
আছেরি-র এই কাহিনি আসলে হিমালয়ের কঠোর জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। প্রাচীনকালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবে পাহাড়ে শিশু মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। হয়তো সেই শোক এবং অবুঝ শিশুদের চলে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতেই তৈরি হয়েছিল এই 'আছেরি'র লোককথা। এটি কেবল একটি ভূত নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের হারানো সন্তানদের স্মৃতির এক অলৌকিক রূপ।